কোষ প্রাচীর, কোষ প্রাচীরের ভৌত ও রাসায়নিক গঠন | এইচএসসি জীববিজ্ঞান

স্বাগতম! আজ আমরা এইচএসসি (একাদশ-দ্বাদশ) শ্রেণীর জীববিজ্ঞান প্রথম পত্রের ১ম অধ্যায় “কোষ ও এর গঠন (Cell and its structure)”-এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় কোষ প্রাচীর (Cell Wall) এবং এর ভৌত ও রাসায়নিক গঠন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

কোষ প্রাচীর কী এবং এর আবিষ্কারের ইতিহাস

১৬৬৫ সালে বিজ্ঞানী রবার্ট হুক (Robert Hooke) অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে যে ছিপি বা কর্কের কোষ দেখেছিলেন, তা মূলত ছিল মৃত কোষের চারপাশের কোষ প্রাচীর। তিনিই প্রথম এর নামকরণ করেন “প্রাচীর” বা “Cell Wall”।

দীর্ঘদিন যাবত এটিকে প্রোটোপ্লাস্টের বর্জিত একটি জড় বস্তু মনে করা হলেও, ১৮০৪ সালে বিজ্ঞানী কার্ল রুডলফি (Karl Rudolphi) এবং জে.এইচ.এফ লিংক (J.H.F. Link) প্রমাণ করেন যে, প্রতিটি কোষের নিজস্ব ও স্বতন্ত্র কোষ প্রাচীর রয়েছে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: কোষ প্রাচীর সম্পূর্ণ জড় ও মৃত উপাদান দিয়ে তৈরি এবং এটি কেবল উদ্ভিদকোষের অনন্য বৈশিষ্ট্য। প্রাণীকোষে কোনো কোষ প্রাচীর থাকে না।

বিভিন্ন জীবে কোষ প্রাচীরের উপাদান

কোষ প্রাচীরের গঠন বিভিন্ন জীবগোষ্ঠী ও প্রজাতিভেদে ভিন্ন হতে পারে। নিচে প্রধান কয়েকটি গ্রুপের কোষ প্রাচীরের রাসায়নিক উপাদানের ছক দেওয়া হলো:

জীবের ধরণ কোষ প্রাচীরের প্রধান উপাদান
উন্নত উদ্ভিদ (Land Plants) সেলুলোজ, হেমিসেলুলোজ এবং পেকটিন
ব্যাকটেরিয়া (Prokaryotes) পেপটিডোগ্লাইকান (Peptidoglycan) বা মিউকোপেপটাইড
ছত্রাক (Fungi) কাইটিন (Chitin) — যা এন-অ্যাসিটাইলগ্লুকোসামিনের পলিমার
শৈবাল (Algae) গ্লাইকোপ্রোটিন এবং পলিস্যাকারাইড (যেমন: ক্যারেজিন ও আগর)
ডায়াটম (Diatom) বায়োজেনিক সিলিকা (Biogenic Silica)
আর্কিয়া (Archaea) সিউডোপেপটিডোগ্লাইকান, গ্লাইকোপ্রোটিন এস-লেয়ার বা পলিস্যাকারাইড

কোষ প্রাচীরের ভৌত গঠন (Physical Structure)

একটি পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদ কোষ প্রাচীরকে অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখলে প্রধানত ৩টি স্তরে বিভক্ত দেখা যায়:

  • ১. মধ্যপর্দা (Middle Lamella): এটি দুটি পাশাপাশি অবস্থিত কোষের মধ্যবর্তী সাধারণ পর্দা হিসেবে কাজ করে। কোষ বিভাজনের সাইটোকাইনেসিস ধাপে সাইটোপ্লাজম থেকে আসা পেকটিক অ্যাসিড এবং পেকটিন জমা হয়ে এই পর্দা তৈরি হয়।

  • ২. প্রাথমিক প্রাচীর (Primary Wall): মধ্যপর্দার ওপর সেলুলোজ, হেমিসেলুলোজ এবং গ্লাইকোপ্রোটিন জমা হয়ে পাতলা ও নমনীয় যে স্তরটি তৈরি হয়, তাকে প্রাথমিক প্রাচীর বলে। এটি সাধারণত ১-৩ মিমি পুরু হয়।

  • ৩. সেকেন্ডারি প্রাচীর (Secondary Wall): কোষের বৃদ্ধি পূর্ণাঙ্গ হলে প্রাথমিক প্রাচীরের ভেতরের দিকে সেলুলোজ এবং লিগনিন জমা হয়ে এই স্তর গঠিত হয়। এটি বেশ পুরু (৫-১০ মিমি) এবং অনমনীয় হয়। সাধারণত ভাজক কোষে এটি থাকে না।

এছাড়াও পাশাপাশি দুটি কোষের প্রাচীরের সূক্ষ্ম ছিদ্রপথে যে সাইটোপ্লাজমিক সংযোগ তৈরি হয়, তাকে প্লাজমোডেসমাটা (Plasmodesmata) বলে।

কোষ প্রাচীরের রাসায়নিক গঠন (Chemical Structure)

রাসায়নিকভাবে উদ্ভিদ কোষ প্রাচীর প্রধানত কার্বোহাইড্রেট বা পলিস্যাকারাইড দিয়ে গঠিত:

  • সেলুলোজ ($C_6H_{10}O_5)_n$: এটি কোষ প্রাচীরের প্রধান কঙ্কাল গঠনকারী উপাদান। প্রায় ১০০টি সেলুলোজ চেইন মিলে একটি মাইসেলি (Micelle) গঠন করে, যাকে কোষ প্রাচীরের গাঠনিক একক ধরা হয়।

  • হেমিসেলুলোজ: এর মধ্যে জাইলান, অ্যারাবিনান, গ্যালাকটান ইত্যাদি পলিস্যাকারাইড থাকে।

  • পেকটিন: এটি মূলত পেকটিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ এক ধরণের আঠালো পদার্থ।

  • অন্যান্য পলিমার: কোষের প্রকারভেদে প্রাচীরে লিগনিন, সুবেরিন বা কিউটিন নামক মোমজাতীয় উপাদান জমা থাকে যা কোষকে জলভেদ্যতা ও দৃঢ়তা দেয়।

কোষ প্রাচীরের প্রধান কাজ

  • আকৃতি প্রদান: কোষকে একটি নির্দিষ্ট ও স্থায়ী রূপ দান করে।

  • সুরক্ষা ও দৃঢ়তা: ভেতরের নরম প্রোটোপ্লাজমকে বাইরের প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করে এবং যান্ত্রিক দৃঢ়তা দেয়।

  • চাপ নিয়ন্ত্রণ: কোষে পানি প্রবেশের সময় কোষের অতিরিক্ত প্রসারণ রোধ করতে এটি অভিস্রবণিক চাপের পরিবাহক হিসেবে কাজ করে।

  • যোগাযোগ রক্ষা: প্লাজমোডেসমাটার মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী কোষের সাথে পানি ও খনিজ লবণ আদান-প্রদানে সাহায্য করে।

ক্লাসটি আরও বিস্তারিতভাবে বুঝতে নিচের ভিডিওটি দেখতে পারেন:

 

মন্তব্য করুন