বাংলায় নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা ও ওষুধ তথ্য

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় Tazid (টেজিড) ওষুধের যাবতীয় তথ্য। বাংলাদেশে সহজলভ্য বিভিন্ন ওষুধের সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য। Tazid (টেজিড) হলো একটি ব্যাকটেরিয়ানাশক সেফালোস্পোরিন অ্যান্টিবায়োটিক, যা বিস্তৃত বর্ণালীর গ্রাম-পজেটিভ এবং গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর। এটি মূলত ইঞ্জেকশন আকারে হাসপাতালে ব্যবহৃত হয়।
জরুরি সতর্কবার্তা: টেজিড একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রেসক্রিপশন-অনলি (Rx) অ্যান্টিবায়োটিক। এটি শুধুমাত্র একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ এবং প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে ব্যবহার করা উচিত। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা শরীরের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ এবং এটি অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি করতে পারে।
Table of Contents
Toggleটেজিড ইঞ্জেকশন হিসেবে মাংসপথে (IM) অথবা শিরাপথে (IV) ব্যবহারের জন্য ভায়াল আকারে পাওয়া যায়। এর সক্রিয় উপাদান হলো সেফটাজিডিম (Ceftazidime) (সেফটাজিডিম পেনটাহাইড্রেট হিসাবে)।
বাজারে এটি নিম্নলিখিত শক্তিতে (Strength) এবং প্যাকেজে পাওয়া যায়:
টেজিড ২৫০ মি.গ্রা. আইএম/আইভি ইঞ্জেকশন: প্রতিটি বাক্সে আছে সেফটাজিডিম ২৫০ মি.গ্রা. এর একটি ভায়াল এবং এর সাথে রয়েছে ৫ মি.লি. ওয়াটার ফর ইঞ্জেকশন বিপি এর একটি অ্যাম্পুল।
টেজিড ৫০০ মি.গ্রা. আইএম/আইভি ইঞ্জেকশন: প্রতিটি বাক্সে আছে সেফটাজিডিম ৫০০ মি.গ্রা. এর একটি ভায়াল এবং এর সাথে রয়েছে ৫ মি.লি. ওয়াটার ফর ইঞ্জেকশন বিপি এর একটি অ্যাম্পুল।
টেজিড ১ গ্রাম আইএম/আইভি ইঞ্জেকশন: প্রতিটি বাক্সে আছে সেফটাজিডিম ১ গ্রাম এর একটি ভায়াল এবং এর সাথে রয়েছে ১০ মি.লি. ওয়াটার ফর ইঞ্জেকশন বিপি এর একটি অ্যাম্পুল।
টেজিড (সেফটাজিডিম) এর বিস্তৃত বর্ণালীর ব্যাকটেরিয়ানাশক কার্যকারিতার কারণে সংবেদনশীল জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রথম পছন্দের ওষুধ হিসাবে এককভাবে ব্যবহৃত হয়। এটি প্রায় সব ধরণের বিটা লেকটামেজ (Beta-lactamase) এনজাইম দ্বারা অকার্যকর হয় না, ফলে এটি অনেক শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধেও কাজ করে।
এটি নিম্নলিখিত চিকিৎসাগত অবস্থায় নির্দেশিত:
যে সমস্ত ইনফেকশনে অন্যান্য অ্যান্টিবায়োটিক (যেমন- অ্যামাইনোগ্লাইকোসাইড এবং অনেক সেফালোস্পোরিন) কার্যকর নয়, সে ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর।
একক সংক্রমণ এবং মিশ্র তীব্র সংক্রমণ (Severe mixed infections)।
শ্বাসনালীর সংক্রমণ (Respiratory tract infections)।
কান, নাক এবং গলার সংক্রমণ (ENT infections)।
চর্ম ও নরমকলার সংক্রমণ (Skin and Soft Tissue infections)।
খাদ্যনালীর সংক্রমণ (Gastrointestinal tract infections)।
অস্থি এবং অস্থি সন্ধির সংক্রমণ (Bone and Joint infections)।
টেজিড ইঞ্জেকশন অবশ্যই হাসপাতালে দক্ষ নার্স বা চিকিৎসকের দ্বারা শিরাপথে (IV) অথবা মাংসপথে (IM) প্রয়োগ করতে হবে। সংক্রমণের তীব্রতা, ধরণ, রোগীর বয়স এবং কিডনীর কার্যকারিতার উপর ভিত্তি করে চিকিৎসক সঠিক মাত্রা নির্ধারণ করবেন।
সরবরাহকৃত তথ্য অনুযায়ী সাধারণ মাত্রা নিম্নরূপ:
বেশীর ভাগ সংক্রমণের ক্ষেত্রে: প্রতিদিন ১ থেকে ৬ গ্রাম, যা ২ থেকে ৩টি সমবিভক্ত মাত্রায় (আইএম অথবা আইভি) দিতে হবে।
মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI): ৫০০ মি.গ্রা. থেকে ১ গ্রাম দিনে ১২ ঘণ্টা পরপর।
তীব্র সংক্রমণের ক্ষেত্রে: ২ গ্রাম করে দিনে ২ থেকে ৩ বার।
প্রোস্টেটিক সার্জারীর ক্ষেত্রে (প্রতিরোধক হিসেবে): ১ গ্রাম, চেতনানাশক (Anesthesia) প্রয়োগের সময় ব্যবহার করতে হবে। ক্যাথেটার পরিহারের সময় দ্বিতীয় একটি মাত্রা ব্যবহার করা যেতে পারে।
সিসটিক ফাইব্রোসিস: ফুসফুসের সিউডোমোনাল সংক্রমণে ১০০-১৫০ মি.গ্রা./কেজি/দিন, যা তিনটি সমবিভক্ত মাত্রায় দিতে হবে (যদি বৃক্কের কার্যকারিতা স্বাভাবিক থাকে)।
২ মাসের উপরের শিশুদের ক্ষেত্রে: ৩০-১০০ মি.গ্রা./কেজি/দিন, যা ২-৩টি বিভক্ত মাত্রায় দিতে হবে।
সিসটিক ফাইব্রোসিস এবং মেনিনজাইটিস: ১৫০ মি.গ্রা./কেজি/দিন পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে (সর্বোচ্চ ৬ গ্রাম দৈনিক)।
নবজাতক এবং ২ মাসের কম বয়সের শিশু: ২৫ থেকে ৬০ মি.গ্রা./কেজি/দিন, যা ২টি বিভক্ত মাত্রায় কার্যকর।
বৃক্কের (কিডনির) অসুবিধায়: সেফটাজিডিম মূলত কিডনির মাধ্যমেই নিঃসৃত হয়। সুতরাং, কিডনির কার্যকারিতা কমে গেলে (ধীর নিঃসরণের কারণে) সেফটাজিডিমের মাত্রা কমিয়ে নিতে হবে। গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেশন (Glomerular filtration) এর মাত্রা ৫০ মি.লি./মি. এর বেশি হলে মাত্রা কমানোর প্রয়োজন হয় না।
পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস: পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিসের সময়ও এটি ব্যবহার করা যায়। শিরাপথে ব্যবহারের পাশাপাশি প্রতি ২ লিটার ফ্লুইডে ১২৫ মি.গ্রা. থেকে ২৫০ মি.গ্রা. পর্যন্ত দেওয়া যেতে পারে।
ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে সেফটাজিডিম একটি সহনশীল ওষুধ। পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সচরাচর দেখা যায় না। তবে কিছু ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে:
ইঞ্জেকশন দেওয়ার স্থানে প্রতিক্রিয়া: শিরাপথে ব্যবহার করলে ফ্লেবাইটিস (শিরার প্রদাহ) বা থ্রম্বোফ্লেবাইটিস হতে পারে। মাংসপথে ব্যবহার করলে ইঞ্জেকশনের স্থানে ব্যথা হতে পারে।
পরিপাকতন্ত্র: ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব, বমি, তলপেটে ব্যথা এবং কদাচিৎ মুখ গহ্বরে গ্রাশ (Oral thrush)।
এলার্জিজনিত প্রতিক্রিয়া: আর্টিকেরিয়া (Urticaria), জ্বর, ত্বকে ফুসকুড়ি (Rash) ইত্যাদি।
জনন মূত্র সংক্রান্ত: ক্যানডিডিয়েসিস (Candidiasis) এবং ভ্যাজাইনিটিস (Vaginitis)।
কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র: মাথাব্যথা, মাথা ঝিমঝিম এবং মুখে খারাপ স্বাদ।
যদি কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দীর্ঘস্থায়ী হয় বা তীব্র আকার ধারণ করে, তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
প্রেগন্যান্সি ক্যাটাগরি বি (Category B)। যদিও গর্ভস্থ শিশুর উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কোন প্রমাণ এখনও পাওয়া যায় নাই, তদুপরি গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে এর ব্যবহারের নিরাপত্তা এখনও পুরোপুরি নির্ধারিত হয় নাই। তাই গর্ভাবস্থায় অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেই কেবল চিকিৎসকের পরামর্শে এটি ব্যবহার করা উচিত।
স্তন্যদানকাল: সেফটাজিডিম মায়ের দুধে নিঃসৃত হয় কি না এবং এর নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত কি না তা তথ্যসূত্রে উল্লেখ নেই। তাই স্তন্যদানকালে ব্যবহারের পূর্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক।
আলো ও আর্দ্রতা থেকে দূরে, ঠান্ডা ও শুষ্ক স্থানে সংরক্ষণ করুন। শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন।
জনসচেতনতা বার্তা: ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার ও জীবনযাপন গাইডলাইন। ওষুধ রাসায়নিক দিক থেকে একটি ক্রিয়াশীল পদার্থ, নির্দিষ্ট মাত্রায় এবং সুনির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত না হলে এটি বিষে পরিণত হতে পারে এবং রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে চিরস্থায়ী ক্ষতির কারণ হয়ে একাধিক জীবন কেড়ে নিতে পারে। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার বা কোর্স সম্পূর্ণ না করা অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক হুমকি। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজের ইচ্ছামতো দীর্ঘদিন একটানা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা উচিত নয়। সচেতনতাই সুস্থ জীবনের মূল ভিত্তি।
এই লেখা শুধুমাত্র শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে। ওষুধ সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সুস্থ থাকার প্রধান চাবিকাঠি হলো একটি সচল পরিপাকতন্ত্র। আমরা প্রতিদিন যে শর্করা, আমিষ কিংবা চর্বিযুক্ত খাবার খাই, তা…
মার্চ 9, 2024
আধুনিক যুগের তীব্র প্রতিযোগিতা, মানসিক চাপ কিংবা পারিপার্শ্বিক নানা কারণে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়া অত্যন্ত সাধারণ…
মার্চ 9, 2024বাংলায় সহজ ভাষায় ওষুধ নির্দেশিকা, রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার এবং মেডিকেল পাঠ্যক্রম।
© মেডিকেল গুরুকুল। এই সাইটের তথ্য শুধুমাত্র শিক্ষামূলক; ওষুধ সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।