বাংলায় নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা ও ওষুধ তথ্য

জীববিজ্ঞান বা বায়োলজির অন্যতম মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হলো ‘কোষ’। যেকোনো জীববিজ্ঞানের পাঠ্যক্রমে, বিশেষ করে এইচএসসি (একাদশ-দ্বাদশ) পর্যায়ে, কোষের গঠন এবং এর প্রকারভেদ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা অপরিহার্য। এই আর্টিকেলে আমরা কোষের সংজ্ঞা, এর আবিষ্কারের ইতিহাস, কোষ তত্ত্ব এবং নিউক্লিয়াসের গঠনের ওপর ভিত্তি করে কোষের প্রধান দুটি প্রকার—আদিকোষ (Prokaryotic Cell) ও প্রকৃতকোষ (Eukaryotic Cell)—সম্পর্কে বিস্তারিত এবং তুলনামূলক আলোচনা করব।
Table of Contents
Toggle
জীববিজ্ঞানের ভাষায়, কোষ (Cell) হলো সকল জীবদেহের গঠনমূলক, কার্যকরী এবং বংশগতিমূলক তথ্য বহনকারী ক্ষুদ্রতম জীবিত একক। সহজ কথায়, একটি ইটের পর ইট গেঁথে যেমন একটি বিশাল ভবন তৈরি হয়, তেমনি অসংখ্য কোষের সমন্বয়ে গঠিত হয় একটি জীবদেহ।
কোষকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘জীবিত সত্তা’ বলা যায়, কারণ এটি স্বাধীনভাবে বিপাকীয় কার্যাবলি (Metabolism) পরিচালনা করতে পারে, প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদন করতে পারে এবং কোষ বিভাজনের মাধ্যমে নিজের প্রতিরূপ সৃষ্টি করতে সক্ষম।
‘সেল’ (Cell) শব্দটি ল্যাটিন শব্দ ‘Cellula’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ‘ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠ’ বা ‘ছোট কুঠুরি’।
১৬৬৫ সালে ইংরেজ বিজ্ঞানী রবার্ট হুক (Robert Hooke) প্রথমবারের মতো একটি সাধারণ অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে বোতলের ছিপির (কর্ক) পাতলা ছেদ পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি সেখানে মৌমাছির চাকের মতো অসংখ্য ছোট ছোট ফাঁকা প্রকোষ্ঠ দেখতে পান। এই প্রকোষ্ঠগুলো দেখতে অনেকটা মঠের সাধু-সন্ন্যাসীদের ছোট ঘরের মতো হওয়ায় তিনি এগুলোর নাম দেন ‘Cell’ বা কোষ। তবে রবার্ট হুক মূলত কর্কের মৃত কোষপ্রাচীর দেখেছিলেন।
পরবর্তীতে ১৮৩৯ সালে বিজ্ঞানী ম্যাথিয়াস জ্যাকব শ্লেইডেন (Matthias Jakob Schleiden) এবং থিওডোর সোয়ান (Theodor Schwann) যুগান্তকারী কোষ তত্ত্ব (Cell Theory) প্রদান করেন। আধুনিক কোষ তত্ত্বের মূল ভিত্তিগুলো হলো:
১. সকল জীবিত প্রাণী ও উদ্ভিদ এক বা একাধিক কোষ দ্বারা গঠিত।
২. কোষ হলো জীবের মৌলিক গাঠনিক ও কার্যকরী একক।
৩. নতুন কোষ সবসময় পূর্ব-অস্তিত্বশীল জীবিত কোষের বিভাজনের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়।
৪. বংশগতীয় তথ্য (DNA) এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে কোষের মাধ্যমেই স্থানান্তরিত হয়।
কোষের অভ্যন্তরে থাকা নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রিকাটি সুগঠিত কি না—তার ওপর ভিত্তি করে কোষকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১. আদিকোষ বা প্রোক্যারিওটিক কোষ (Prokaryotic Cell)
২. প্রকৃতকোষ বা ইউক্যারিওটিক কোষ (Eukaryotic Cell)
‘Prokaryote’ শব্দটি দুটি গ্রিক শব্দ ‘Pro’ (আদি বা পূর্ববর্তী) এবং ‘Karyon’ (নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রিকা) থেকে এসেছে। অর্থাৎ, যে কোষে সুগঠিত কোনো নিউক্লিয়াস থাকে না, তাকে আদিকোষ বলে। বিবর্তনের ধারায় এই কোষগুলো পৃথিবীতে সবচেয়ে আগে আবির্ভূত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। ব্যাকটেরিয়া এবং সায়ানোব্যাকটেরিয়া (নীলাভ-সবুজ শৈবাল) হলো আদিকোষের প্রধান উদাহরণ।
‘Eukaryote’ শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘Eu’ (প্রকৃত বা সুগঠিত) এবং ‘Karyon’ (নিউক্লিয়াস) থেকে এসেছে। যে কোষে সুগঠিত নিউক্লিয়াস থাকে, অর্থাৎ যার নিউক্লিয়াসটি একটি সুনির্দিষ্ট নিউক্লিয়ার ঝিল্লি (Nuclear Membrane) দ্বারা আবৃত থাকে, তাকে প্রকৃতকোষ বলে। উদ্ভিদ, প্রাণী, ছত্রাক এবং শৈবাল (নীলাভ-সবুজ শৈবাল বাদে) প্রকৃতকোষ দ্বারা গঠিত।
আকারে একটি আদর্শ প্রকৃতকোষ আদিকোষের তুলনায় অনেক বড় এবং জটিল। এর আয়তন একটি আদিকোষের তুলনায় ১০০০ গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।
পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং সহজভাবে মনে রাখার জন্য আদিকোষ ও প্রকৃতকোষের মূল পার্থক্যগুলো নিচে একটি ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| বৈশিষ্ট্যের নাম | আদিকোষ (Prokaryotic Cell) | প্রকৃতকোষ (Eukaryotic Cell) |
| নিউক্লিয়াস | সুগঠিত নিউক্লিয়াস থাকে না (নিউক্লিঅয়েড থাকে)। | সুগঠিত ও ঝিল্লি-আবৃত নিউক্লিয়াস উপস্থিত। |
| ডিএনএ-র গঠন | সাধারণত বৃত্তাকার এবং হিস্টোন প্রোটিনবিহীন। | রৈখিক এবং হিস্টোন প্রোটিন যুক্ত (ক্রোমোসোম গঠন করে)। |
| ঝিল্লি-আবৃত অঙ্গাণু | মাইটোকন্ড্রিয়া, গলগি বস্তু ইত্যাদি অনুপস্থিত। | মাইটোকন্ড্রিয়া, গলগি বস্তু, লাইসোজোম ইত্যাদি উপস্থিত। |
| রাইবোজোম | আকারে ছোট, 70S প্রকৃতির। | আকারে বড়, 80S প্রকৃতির। |
| কোষের আকার | সাধারণত ছোট (১-১০ মাইক্রোমিটার)। | সাধারণত বড় (১০-১০০ মাইক্রোমিটার)। |
| কোষ বিভাজন | প্রধানত অ্যামাইটোসিস (দ্বি-বিভাজন বা Binary Fission) প্রক্রিয়ায় ঘটে। | মাইটোসিস ও মিয়োসিস প্রক্রিয়ায় ঘটে। |
| উদাহরণ | ব্যাকটেরিয়া, সায়ানোব্যাকটেরিয়া। | উদ্ভিদ, প্রাণী, ছত্রাক, প্রোটোজোয়া। |
কোষবিদ্যা (Cytology) কেবল একটি তাত্ত্বিক বিষয় নয়; এটি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান, জেনেটিক্স এবং বায়োটেকনোলজির মূল ভিত্তি। আদিকোষ এবং প্রকৃতকোষের মধ্যে গাঠনিক পার্থক্য থাকার কারণেই অ্যান্টিবায়োটিকগুলো আমাদের শরীরের প্রকৃতকোষগুলোর কোনো ক্ষতি না করে কেবল ব্যাকটেরিয়াকে (আদিকোষ) আক্রমণ করতে ও ধ্বংস করতে পারে। তাই কোষের গঠন ও কার্যাবলি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করা জীববিজ্ঞানের যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্য প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

১. কোষ তত্ত্বের জনক কে?
কোষ তত্ত্বের প্রবক্তা হলেন বিজ্ঞানী ম্যাথিয়াস জ্যাকব শ্লেইডেন এবং থিওডোর সোয়ান (১৮৩৯ সাল)।
২. আদিকোষে কি ডিএনএ থাকে?
হ্যাঁ, আদিকোষে ডিএনএ থাকে। তবে তা কোনো নিউক্লিয়ার ঝিল্লি দ্বারা আবৃত থাকে না; এটি সাইটোপ্লাজমে মুক্ত অবস্থায় থাকে, যাকে নিউক্লিঅয়েড বলে।
৩. প্লাজমিড কী এবং এটি কোন কোষে পাওয়া যায়?
প্লাজমিড হলো ব্যাকটেরিয়ার (আদিকোষ) মূল ক্রোমোসোমাল ডিএনএ-র বাইরে অবস্থিত একটি ছোট, বৃত্তাকার এক্সট্রাক্রোমোসোমাল ডিএনএ, যা প্রায়শই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বৈশিষ্ট্য বহন করে।
৪. মানুষের শরীরের কোষগুলো কী ধরনের?
মানুষের শরীরের সকল কোষ প্রকৃতকোষ বা ইউক্যারিওটিক প্রকৃতির, কারণ এগুলোতে সুগঠিত নিউক্লিয়াস এবং বিভিন্ন ঝিল্লি-আবৃত অঙ্গাণু রয়েছে।
৫. আদিকোষ ও প্রকৃতকোষে কোন সাধারণ অঙ্গাণুটি পাওয়া যায়?
রাইবোজোম (Ribosome) নামক আবরণীবিহীন অঙ্গাণুটি আদিকোষ এবং প্রকৃতকোষ—উভয় ধরনের কোষেই পাওয়া যায়। কারণ প্রোটিন সংশ্লেষণ সকল জীবিত কোষের জন্যই অপরিহার্য।
কোষের মৌলিক ধারণা: কোষ হলো জীবনের মৌলিক গাঠনিক ও কার্যকরী একক। রবার্ট হুক ১৬৬৫ সালে প্রথম কোষ শব্দটি ব্যবহার করেন।
আদিকোষ (Prokaryote): যে কোষে সুগঠিত নিউক্লিয়াস এবং ঝিল্লি-আবৃত কোনো অঙ্গাণু (যেমন- মাইটোকন্ড্রিয়া) থাকে না। উদাহরণ: ব্যাকটেরিয়া।
প্রকৃতকোষ (Eukaryote): যে কোষে সুনির্দিষ্ট নিউক্লিয়ার ঝিল্লি দ্বারা আবৃত সুগঠিত নিউক্লিয়াস এবং বিভিন্ন অঙ্গাণু উপস্থিত থাকে। উদাহরণ: উদ্ভিদ ও প্রাণীকোষ।
পার্থক্যকারী বৈশিষ্ট্য: আদিকোষে 70S রাইবোজোম এবং বৃত্তাকার ডিএনএ থাকে, অন্যদিকে প্রকৃতকোষে 80S রাইবোজোম এবং রৈখিক ক্রোমোসোমাল ডিএনএ থাকে।
কোষ এর সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ, আদিকোষ ও প্রকৃতকোষ নিয়ে বিস্তারিত :
এই লেখা শুধুমাত্র শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে। ওষুধ সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কখনো নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছেন? আমাদের যে এই শরীর, হাত-পা, চোখ-মুখ – সব মিলিয়ে কেমন…
আগস্ট 29, 2022
কোষঝিল্লির রাসায়নিক উপাদান ও কোষঝিল্লির বিভিন্ন অবস্থা আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। “কোষঝিল্লির রাসায়নিক উপাদান ও কোষঝিল্লির বিভিন্ন অবস্থা…
আগস্ট 4, 2022বাংলায় সহজ ভাষায় ওষুধ নির্দেশিকা, রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার এবং মেডিকেল পাঠ্যক্রম।
© মেডিকেল গুরুকুল। এই সাইটের তথ্য শুধুমাত্র শিক্ষামূলক; ওষুধ সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।