পায়ুপথ বা মলদ্বারের একদম ভেটারে এবং নিম্নভাগে অবস্থিত এনাল কুশনগুলোর (Anal Cushions) সাবমিউকোসাল রক্তনালী (সাবমিউকোসাল ভেন) বা শিরাসমূহ যখন অতিরিক্ত চাপের কারণে প্রসারিত, স্ফীত ও প্রদাহাক্রান্ত হয়ে পড়ে, তখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় তাকে ‘হেমোরয়েডস’ (Hemorrhoids) বলা হয়। লোকমুখে এটি অর্শ বা পাইলস নামে সমধিক পরিচিত।
মানবদেহের রক্তসংবহন তন্ত্রের এই নির্দিষ্ট স্থানটিতে শিরাগুলোর নমনীয়তা এবং মলদ্বারের কুপারস লিগামেন্ট বা মসৃণ পেশিকলার বন্ধন শিথিল হয়ে গেলে ভেনাস পেশার বা শিরার ভেতরের চাপ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে সেখানে ছোট-বড় পিণ্ড বা পকেটের মতো স্ফীতি তৈরি হয়। বয়সের সীমাবদ্ধতা না থাকলেও প্রবীণ, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি কোষ্ঠকাঠিন্যে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বহুগুণ বেশি দেখা যায়।

অর্শের প্যাথলজিক্যাল প্রকারভেদ ও স্টেজ
চিকিৎসা বিজ্ঞানের মানদণ্ডে মলদ্বারের ডেন্টাট লাইন (Dentate Line)-এর ওপর ভিত্তি করে অর্শকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়, যা রোগের তীব্রতা এবং চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণে সহায়ক:
[এনাল ক্যানাল / মলদ্বার]
│
┌────────────────┴────────────────┐
▼ ▼
[ইন্টারনাল বা অভ্যন্তরীণ] [এক্সটার্নাল বা বাহ্যিক]
(ডেন্টাট লাইনের ওপরে অবস্থিত) (ডেন্টাট লাইনের নিচে অবস্থিত)
│ │
┌─────────┼─────────┬─────────┐ ▼
▼ ▼ ▼ ▼ (পেইন রিসেপ্টরযুক্ত,
স্টেজ ১ স্টেজ ২ স্টেজ ৩ স্টেজ ৪ তীব্র যন্ত্রণাদায়ক ও ফোলা)
১. ইন্টারনাল হেমোরয়েডস (Internal Hemorrhoid)
এটি ডেন্টাট লাইনের ওপরে এনাল ক্যানালের ভেতরে অবস্থান করে। যেহেতু এই অংশটির স্নায়ু সংযোগ ভিসারাল (Visceral Pain Receptors কম থাকে), তাই সাধারণ অবস্থায় অভ্যন্তরীণ অর্শে কোনো ব্যথা বা অনুভূতি থাকে না। তবে মলত্যাগের সময় ফ্রেশ লাল রক্তপাত হওয়া এর প্রধান লক্ষণ। এর স্ফীতির তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে একে চারটি গ্রেড বা স্টেজে ভাগ করা হয়:
গ্রেড ১ (Grade I): রক্তনালীগুলো হালকা স্ফীত হয় কিন্তু এনাল ক্যানালের বাইরে বেরিয়ে আসে না। শুধুমাত্র মলত্যাগের সময় ব্যথাহীন রক্তপাত হতে পারে।
গ্রেড ২ (Grade II): মলত্যাগের সময় বাড়তি চাপের কারণে অর্শের মাংসপিণ্ড বাইরে বেরিয়ে আসে, তবে মলত্যাগ শেষে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবার ভেতরে ঢুকে যায়।
গ্রেড ৩ (Grade III): মলত্যাগের সময় অর্শপিণ্ড বাইরে বেরিয়ে আসে এবং তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেতরে যায় না। আঙুল দিয়ে চেপে ভেতরে ঢুকিয়ে দিতে হয়।
গ্রেড ৪ (Grade IV): অর্শপিণ্ড স্থায়ীভাবে বাইরে বেরিয়ে থাকে, আঙুল দিয়ে চেপেও আর ভেতরে ঢোকানো যায় না। এ পর্যায়ে থ্রম্বোসিস বা রক্ত জমাট বাঁধার চরম ঝুঁকি থাকে।
২. এক্সটার্নাল হেমোরয়েডস (External Hemorrhoid)
এটি ডেন্টাট লাইনের নিচে মলদ্বারের বহিরাংশের ত্বকের নিচে অবস্থিত। যেহেতু এখানে সোমাটিক নার্ভ বা পেইন রিসেপ্টর প্রচুর পরিমাণে থাকে, তাই বাহ্যিক অর্শে তীব্র ব্যথা, চুলকানি, প্রদাহ এবং অস্বস্তি হয়। বিশেষ করে যখন এর ভেতর রক্ত জমাট বাঁধে (Thrombosed External Hemorrhoid), তখন তীব্র যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়।
অর্শ রোগের মূল কারণ ও আধুনিক ঝুঁকিসমূহ
অর্শের পেছনে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে এনাল কুশনের ওপর অতিরিক্ত প্রেশার বা চাপ। এই চাপ সৃষ্টির পেছনের বৈজ্ঞানিক কারণগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
দীর্ঘমেয়াদি কোষ্ঠকাঠিন্য ও ডায়রিয়া: শক্ত মল ত্যাগের সময় এনাল ক্যানালে অতিরিক্ত কোঁথ (Straining) দিলে সাবমিউকোসাল রক্তনালীগুলো প্রসারিত হয়ে ফেটে যায় বা ফুলে ওঠে। অপরদিকে দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া থাকলেও এনাল মিউকোসায় বারবার ঘর্ষণজনিত প্রদাহ সৃষ্টি হয়।
বংশগত ও গঠনগত দুর্বলতা: পরিবারের পূর্বপুরুষদের অর্শের ইতিহাস থাকলে শিরার দেয়াল বা ভালভ এবং এনাল কুশনের পেশি টিস্যু দুর্বল হওয়ার জিনগত প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
গর্ভাবস্থা ও পেলভিক চাপ: গর্ভাবস্থায় ক্রমবর্ধমান জরায়ু নিচের দিকের ভেনা কাভা শিরা এবং পেলভিক রক্তনালীর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। এছাড়া গর্ভাবস্থার হরমোন (যেমন প্রোজেস্টেরন) রক্তনালীর দেয়ালকে শিথিল করে দেয়।
অত্যধিক বসে থাকার জীবনধারা: দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে কাজ করলে বা নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন করলে রেক্টো-সিগময়েড অঞ্চলে রক্ত সঞ্চালন ধীর হয়ে যায় এবং পেলভিক ফ্লোরে স্থির রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়।
ভারী বস্তু উত্তোলন: প্রতিনিয়ত ভারী ওজন তোলার ফলে ইন্ট্রা-অ্যাবডোমিনাল প্রেশার (পেটের ভেতরের চাপ) হঠাৎ অনেক বেড়ে যায়, যা সরাসরি পায়ুপথের শিরাগুলোর ওপর প্রভাব ফেলে।
স্থূলতা ও ভুল খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত দৈহিক ওজন এবং খাদ্যে ফাইবারের তীব্র অভাব অর্শের অন্যতম নীরব কারণ।
অর্শ থেকে স্থায়ী স্বস্তি পেতে ৫টি জীবনধারাগত পরিবর্তন
প্রাথমিক ও মাঝারি পর্যায়ের অর্শ (বিশেষ করে গ্রেড ১, ২ এবং কিছু ক্ষেত্রে ৩) সার্জারি বা অস্ত্রোপচার ছাড়াই কেবল জীবনযাত্রার মান ও অভ্যাসে সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন এনে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। নিচে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:
১. খাদ্যাভ্যাসে ডায়েটারি ফাইবারের সঠিক সংযোজন
কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করাই অর্শের মূল চিকিৎসা। ফাইবারের মূল কাজ হলো খাদ্যনালীতে পানি ধরে রেখে মলের পরিমাণ ও আর্দ্রতা বাড়ানো, যার ফলে মল নরম ও ভারী হয় এবং কোনো চাপ প্রয়োগ ছাড়াই সহজে নিষ্কাশিত হতে পারে।
| ফাইবারের ধরন | কাজের ধরণ | খাবারের উৎস |
| অদ্রবণীয় ফাইবার (Insoluble Fiber) | মলের আকার ও স্পঞ্জি গঠন তৈরি করে, মলদ্বারের মধ্য দিয়ে দ্রুত চলাচলে সাহায্য করে। | গমের ভুষি, আস্ত শস্য, বাদাম, সবুজ শাকসবজি (পালং, নটে), ঢ্যাঁড়শ, পটলের খোসা। |
| দ্রবণীয় ফাইবার (Soluble Fiber) | পানির সাথে মিশে জেলির মতো পদার্থ তৈরি করে মলকে পিচ্ছিল ও নরম রাখে। | ইস্পাগুলা (ইসবগুলের ভূসি), ওটস, আপেল, পেঁপে, কলা, চিয়া সিড, ডাল। |
দৈনিক ফাইবারের লক্ষ্যমাত্রা: একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম খাদ্য ফাইবার গ্রহণ করা উচিত।
খাদ্যাভ্যাস সংশোধন: দুপুরে ও রাতে যেকোনো শাকসবজি নিয়মিত রাখা উচিত। খোসাসহ শসা, পেঁপে ও ঢ্যাঁড়শে থাকা মিউসিলেজ জাতীয় ফাইবার মলদ্বারকে ক্ষতর হাত থেকে রক্ষা করে।
সতর্কতা: হঠাৎ করে খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত ফাইবার যুক্ত করলে পেটে গ্যাস বা ফাপ হতে পারে। তাই ধীরে ধীরে ফাইবারের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
২. তরল গ্রহণ ও হাইড্রেশন নিশ্চিতকরণ
ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার তখনই কাজ করবে, যখন শরীরে পর্যাপ্ত পানি থাকবে। পানি ছাড়া কেবল অতিরিক্ত ফাইবার খেলে মল আরও শক্ত হয়ে কোষ্ঠকাঠিন্য মারাত্মক রূপ নিতে পারে।
পানির মাত্রা: প্রতিদিন অন্তত ৩ থেকে ৪ লিটার (৮-১০ গ্লাস) বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে।
কার্যপদ্ধতি: পর্যাপ্ত পানিপান কোলনে মলের আর্দ্রতা সঠিক রাখে। এর ফলে পরিপাকতন্ত্রে মলের ট্রানজিট টাইম বা চলাচলের সময় স্বাভাবিক থাকে।
সহায়ক পানীয়: ডাবের পানি, ইসবগুল ভেজানো পানি, লেবুর শরবত বা পাতলা ঘোল পরিপাকতন্ত্রের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে অতিরিক্ত ক্যাফেইন (চা, কফি) ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা দরকার, কারণ এগুলো শরীরকে পানিশূন্য (Dehydrate) করে তোলে।
৩. গতিশীল জীবনধারা ও সঠিক ব্যায়াম
দীর্ঘক্ষণ একই জায়গায় বসে থাকার অভ্যাস মলদ্বারের শিরার ভেতরে রক্ত সঞ্চালন থামিয়ে দেয় এবং ভেনাস প্রেসার বাড়ায়।
কাজের মাঝে বিরতি: অফিসে বা ডেস্কে একটানা বসে কাজ করার অভ্যাস থাকলে প্রতি ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট পর পর ৫ মিনিটের জন্য উঠে দাঁড়ান বা একটু হাঁটাচলা করুন।
অ্যারোবিক ব্যায়াম: দিনে অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা (Brisk Walking), হালকা যোগব্যায়াম বা সাঁতার কাটা এনাল মাসল এবং অন্ত্রের পেরিস্টালসিস (Peristalsis) বা স্বাভাবিক সংকোচন-প্রসারণ গতি বাড়ায়।
পেলভিক ফ্লোর এক্সারসাইজ (কেগেল ব্যায়াম): পেলভিক ফ্লোরের পেশি শক্তিশালী করতে কেগেল ব্যায়াম অত্যন্ত কার্যকরী। এটি এনাল ক্যানালের রক্তনালীগুলোর ওপর ধরে রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং পোপস বা পেলভিক অঙ্গের স্থানচ্যুতি রোধ করে।
৪. মলত্যাগের অভ্যাস ও টয়লেট হাইজিন সংশোধন
মলত্যাগের সময় ভুল ভঙ্গি এবং কুঅভ্যাস এনাল ক্যানালের মিউকোসাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
কোঁথ বা চাপ প্রয়োগ না করা: মলত্যাগের সময় জোর করে চাপ দেওয়া অর্শের প্রধান শত্রু। ৫ থেকে ৭ মিনিটের বেশি টয়লেটে বসে থাকা একদম উচিত নয়।
টয়লেটে স্মার্টফোন ব্যবহার বন্ধ করা: টয়লেট সিটে বসে দীর্ঘক্ষণ স্মার্টফোন ব্যবহার করা বা পেপার পড়ার অভ্যাসের কারণে অজান্তেই মলদ্বারের ওপর একটানা মাধ্যাকর্ষণজনিত চাপ পড়তে থাকে, যা অর্শকে জটিল করে তোলে।
সঠিক বসার ভঙ্গি (Squatting Position): ওয়েস্টার্ন বা কমোড ব্যবহারের সময় পায়ের নিচে একটি ৫-৬ ইঞ্চির ছোট টুল (Toilet Stool) ব্যবহার করে কোণ তৈরি করলে পাবোরেক্টালিস পেশি (Puborectalis Muscle) সম্পূর্ণ শিথিল হয়, ফলে রেকটাম বা মলাশয় সোজা হয় এবং মল সহজে বের হয়ে আসে।
[কমোডে সোজা হয়ে বসা (Traditional 90°)] [টুল ব্যবহার করে বসা (Squatting 35°)]
পাবোরেক্টালিস পেশি টানটান থাকে পাবোরেক্টালিস পেশি শিথিল হয়
│ │
▼ ▼
(মলদ্বারে বাঁক ও চাপ সৃষ্টি) (সোজা পথ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় মলত্যাগ)
৫. ট্রিগার ফুড ও প্রসেসড খাবার বর্জন
পরিপাকতন্ত্রে প্রদাহ সৃষ্টিকারী এবং কোষ্ঠকাঠিন্য সহায়ক খাবারগুলো এড়িয়ে চলা অর্শ নিয়ন্ত্রণের অন্যতম পূর্বশর্ত।
রেড মিট ও প্রক্রিয়াজাত খাবার: গরু বা খাসির মাংস, প্রক্রিয়াজাত মিট, ফার্স্ট ফুড ও ময়দার তৈরি খাবারে ফাইবার একদম থাকে না বললেই চলে। এগুলো অন্ত্রে হজম হতে অনেক সময় নেয় এবং শক্ত মল তৈরি করে।
অতিরিক্ত ঝাল ও মসলাযুক্ত খাবার: অতিরিক্ত কাঁচা মরিচ, লাল মরিচের গুঁড়া ও ঝাল মসলা মলদ্বারের ক্ষত বা স্ফীত মিউকোসায় তীব্র জ্বালাপোড়া ও প্রদাহ সৃষ্টি করে।
রিফাইন্ড সুগার ও ভাজাপোড়া: অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার এবং পরিশোধিত চিনি কোলনের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার (Gut Microbiome) সামঞ্জস্য নষ্ট করে হজমে ব্যাঘাত ঘটায়।
অর্শ রোগীদের জন্য বিশেষ সিটজ বাথ (Sitz Bath) এর ভূমিকা
মলদ্বারের ফোলা ভাব, চুলকানি ও তীব্র ব্যথা কমানোর জন্য ‘সিটজ বাথ’ একটি চমৎকার ও বিজ্ঞানসম্মত ঘরোয়া পদ্ধতি।
সিটজ বাথ নেওয়ার সঠিক নিয়ম:
১. একটি গামলা বা বিশেষ সিটজ বাথ টবে সহনীয় মাত্রার হালকা গরম পানি নিন।
২. পানিতে কোনো কড়া অ্যান্টিসেপটিক, স্যাভলন বা কেমিক্যাল মেশানোর প্রয়োজন নেই (প্রয়োজনে অল্প প্রাকৃতির পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট বা ডাক্তারের পরামর্শে বেকিং সোডা দেওয়া যেতে পারে)।
৩. আক্রান্ত স্থান বা নিতম্ব ওই গরম পানিতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট ডুবিয়ে রাখুন।
৪. দিনে ২ থেকে ৩ বার মলত্যাগের পর এটি করুন। হালকা গরম পানি মলদ্বারের স্ফিংটার পেশিকে শিথিল করে এবং স্থানীয় রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে দ্রুত ব্যথা ও প্রদাহ কমায়।
কখন বিশেষজ্ঞ প্রোকটোলজিস্টের পরামর্শ নেবেন?
জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত অভিজ্ঞ প্রোকটোলজিস্ট বা কোলোরেক্টাল সার্জনের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি:
মলের সাথে বা মলত্যাগের পর অনবরত স্প্রে-র মতো তাজা রক্তপাত হলে।
মলদ্বারে প্রচণ্ড তীব্র ব্যথা হলে (যা মূলত থ্রম্বোসাইট বা রক্ত জমাট বাঁধার লক্ষণ)।
অর্শের সাথে অস্বাভাবিক ওজন হ্রাস, দীর্ঘদিনের জ্বর বা অ্যানিমিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে।
যদি অর্শপিণ্ড বাইরে বেরিয়ে আসে এবং কোনোভাবেই ভেতরে আর না ঢোকানো যায় (গ্রেড ৪)।
৫০ বছর বা তার বেশি বয়সে হঠাৎ নতুন করে কোষ্ঠকাঠিন্য বা মলত্যাগের অভ্যাসে আকস্মিক পরিবর্তন দেখা দিলে (যাতে কোলোরেক্টাল ক্যান্সার বা কোলন পলিপের ঝুঁকি যাচাই করা যায়)।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. অর্শ বা পাইলস কি ওষুধ দিয়েই স্থায়ীভাবে সেরে যায়?
উত্তর: প্রাথমিক পর্যায়ের (গ্রেড ১ ও ২) অর্শ সাধারণত খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, ফাইবার গ্রহণ এবং প্রোকটোলজি বিশেষজ্ঞের পরামর্শে কিছু মলদ্বারের সাপোজিটরি বা ফ্লেবোটোনিক (পিচ্ছিলকারক ও শিরা শক্তিশালীকারী) ওষুধের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। তবে জটিল বা উন্নত পর্যায়ে (গ্রেড ৩ ও ৪) ব্যান্ড লাইগেশন, স্লেরোথেরাপি বা আধুনিক লেজার সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে।
২. ইসবগুলের ভূসি খাওয়ার সঠিক নিয়ম কী?
উত্তর: ইসবগুলের ভূসি পানিতে ভিজিয়ে রেখে সঙ্গে সঙ্গে খেয়ে ফেলা উচিত। অনেকে রাতে ভিজিয়ে রেখে সকালে খান, যা ঠিক নয়। পানিতে ভেজানোর পর এটি দ্রুত জেলিতে পরিণত হয়, যা তাৎক্ষণিক খেলে পেটের ভেতর গিয়ে পানি শোষণ করে মলকে নরম করতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
৩. অর্শ ও এনাল ফিশারের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: অর্শ হলো মলদ্বারের রক্তনালী ফুলে ওঠা, যাতে সাধারণত প্রথমে ব্যথা থাকে না কিন্তু ফ্রেশ রক্তপাত হয়। অন্যদিকে, এনাল ফিশার হলো শক্ত মলের ঘর্ষণে মলদ্বারের ত্বক বা মিউকোসা ফেটে যাওয়া বা ছিলে যাওয়া ক্ষত, যাতে মলত্যাগের সময় ও পরে তীব্র কাটার মতো ব্যথা ও সামান্য রক্তপাত হয়।
৪. লেজার পাইলস সার্জারি কি নিরাপদ?
উত্তর: হ্যাঁ, আধুনিক প্রোকটোলজিতে লেজার হেমোরয়েডোপ্লাস্টি (LHP) অত্যন্ত নিরাপদ ও কার্যকর পদ্ধতি। এতে কোনো ধরনের বড় কাটাকাটি বা সেলাই থাকে না, রক্তপাত ও ব্যথা নগণ্য এবং রোগী খুব দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন।
৫. অর্শ রোগীদের জন্য কোকোনাট ওয়েল বা নারকেল তেল ব্যবহার কি উপকারী?
উত্তর: নারকেল তেলে প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ও অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল উপাদান থাকে। মলদ্বারের বহিরাংশে বাহ্যিক অর্শের ফোলা ও চুলকানি স্থানে বিশুদ্ধ নারকেল তেল আলতো করে লাগালে তা প্রাকৃতিক লুব্রিকেন্ট হিসেবে কাজ করে শুষ্কতা ও অস্বস্তি কমায়।

একনজরে
- অর্শ বা হেমোরয়েডস মূলত মলদ্বারের রক্তনালীর চাপজনিত স্ফীতি, যা প্রাথমিক অবস্থায় জীবনযাত্রার মান পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ দূর করা সম্ভব।
- প্রতিদিনের খাবারে অন্তত ২৫-৩০ গ্রাম ফাইবার (শাকসবজি, ফলমূল, আস্ত শস্য) এবং ৩-৪ লিটার পানি যুক্ত করা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।
- টয়লেটে বেশি সময় বসে থাকা এবং মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত কোঁথ দেওয়া বা চাপ দেওয়া সরাসরি বন্ধ করতে হবে।
- একটানা বসে না থেকে দৈনিক ৩০ মিনিট মাঝারি হাঁটাচলা ও কেগেল ব্যায়াম এনাল কুশনের রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখে।
- মলদ্বারে তীব্র ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তপাত বা ৫০ বছরের পর নতুন উপসর্গ দেখা দিলে অলৌকিক বা অপচিকিৎসায় সময় নষ্ট না করে কোলোরেক্টাল সার্জনের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
