বাংলায় নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা ও ওষুধ তথ্য

আমাদের ত্বকের উপরিভাগে প্রাকৃতিকভাবেই এক ধরণের তৈলাক্ত উপাদান বা সেবাম (Sebam) নিঃসৃত হয়, যা ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং বাইরের ধুলোবালি বা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ থেকে ত্বককে রক্ষা করতে একটি প্রাকৃতিক দেয়াল বা ব্যারিয়ার হিসেবে কাজ করে। কিন্তু শীতকালের শুষ্ক আবহাওয়া, অতিরিক্ত ক্ষারযুক্ত সাবানের ব্যবহার, পুষ্টির অভাব কিংবা কিছু চর্মরোগের কারণে ত্বকের এই আর্দ্রতা হারিয়ে যায়। এর ফলে ত্বক অতিরিক্ত খসখসে, শুষ্ক, ফাটা এবং চুলকানিযুক্ত হয়ে পড়ে। এই শুষ্কতা দীর্ঘস্থায়ী হলে ত্বকে একজিমা (Eczema) কিংবা সোরিয়াসিস (Psoriasis)-এর মতো যন্ত্রণাদায়ক চর্মরোগের সৃষ্টি হতে পারে। এই ধরণের শুষ্ক ও প্রদাহজনিত ত্বকের গভীর থেকে আর্দ্রতা ফিরিয়ে আনতে এবং ত্বকের উপরিভাগে সুরক্ষাকারী স্তর তৈরি করতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘টপিক্যাল ইমোলিয়েন্ট’ বা ময়েশ্চারাইজিং ক্রিম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে শুষ্ক ত্বক এবং বিভিন্ন চর্মরোগের চিকিৎসায় চিকিৎসকদের বহুল ব্যবহৃত একটি অত্যন্ত কার্যকর ও নিরাপদ ক্রিম হলো Emolent (ইমোলেন্ট)। আজকের নিবন্ধে আমরা স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের উৎপাদিত এই ক্রিমের উপাদান, সঠিক ব্যবহার বিধি এবং এর যৌক্তিক ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
জরুরি মেডিকেল ডিসক্লেমার (Medical Disclaimer): ইমোলেন্ট ক্রিম বাহ্যিক ত্বকের আর্দ্রতা রক্ষায় ব্যবহৃত একটি অত্যন্ত নিরাপদ থেরাপিউটিক ক্রিম। তবে আপনার ত্বকের শুষ্কতা যদি কোনো জটিল চর্মরোগের কারণে হয়ে থাকে, তবে সঠিক রোগ নির্ণয় এবং মূল চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের (Dermatologist) পরামর্শ নেওয়া উচিত।
Table of Contents
Toggleওষুধের শ্রেণি: টপিক্যাল ইমোলিয়েন্ট / স্কিন প্রোটেক্ট্যান্ট (Topical Emollient)।
ডোজ ফর্ম: বাহ্যিক ব্যবহারের ক্রিম (Topical Cream)।
প্রতি গ্রাম ইমোলেন্ট ক্রিমে রয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক পরিমাপ (BP) অনুযায়ী দুটি চমৎকার হাইড্রেটিং উপাদান:
লাইট লিকুইড প্যারাফিন বিপি (Light Liquid Paraffin BP): ৬০ মি.গ্রা.।
হোয়াইট সফট প্যারাফিন বিপি (White Soft Paraffin BP): ১৫০ মি.গ্রা.।
এই উপাদানগুলো ত্বকের উপরিভাগে একটি অদৃশ্য তেল বা মোমের মতো প্রতিরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে, যা ত্বকের ভেতরের জলীয় অংশ বা আর্দ্রতাকে বাতাসে উড়ে যেতে বাধা দেয়।
শুষ্ক ত্বকের চিকিৎসা (Dry Skin/Xerosis): যেকোনো কারণে ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক, খসখসে, রুক্ষ হয়ে গেলে বা চামড়া ফেটে আশের মতো উঠলে তা দূর করতে।
একজিমা (Eczema): একজিমাজনিত ত্বকের তীব্র শুষ্কতা, চুলকানি এবং চামড়া উঠে যাওয়া রোধে এটি একটি প্রধান সহযোগী থেরাপী (Adjuvant Therapy) হিসেবে কাজ করে।
সোরিয়াসিস (Psoriasis): সোরিয়াসিস আক্রান্ত ত্বকে যে রূপালী রঙের মরা চামড়ার স্তর বা চাবড়া তৈরি হয়, তাকে নরম করে তুলতে এবং ত্বকের অস্বস্তি ও টানটান ভাব কমাতে এটি ব্যবহৃত হয়।
ত্বকীয় প্রদাহ উপশম: বিভিন্ন ধরণের ডার্মাটাইটিস বা ত্বকের প্রদাহের কারণে সৃষ্ট জ্বালাপোড়া ও চুলকানি প্রশমিত করতে।
আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার করা: প্রথমে আক্রান্ত ত্বক বা শরীর হালকা গরম জল বা মৃদু সাবান দিয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে।
প্রয়োগের সঠিক সময়: অধিক কার্যকর এবং দীর্ঘস্থায়ী ফলাফল পেতে হলে শরীর ধৌত করার বা গোসল করার ঠিক পরপরই (৩ মিনিটের মধ্যে) এই ক্রিমটি ব্যবহার করা সবচেয়ে উত্তম। কারণ গোসলের পর ত্বকের উপরিভাগের কোষ বা ‘স্ট্র্যাটাম কর্নিয়াম’-এ সেবামের পরিমাণ সাময়িকভাবে কমে যায় এবং ত্বক তার স্বাভাবিক আর্দ্রতা হারাতে শুরু করে। এই সময়ে ক্রিমটি লাগালে তা ত্বকের জলীয় অংশকে ভেতরে লক করে দেয়।
প্রয়োগ পদ্ধতি: পরিমাণমতো ক্রিম নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বা শুষ্ক স্থানে আলতো করে ঘষে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। এটি দিনে প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিকবার (যেমন—সকালে, গোসলের পর এবং রাতে ঘুমানোর আগে) ব্যবহার করা যেতে পারে।
উপাদানের প্রতি অতিসংবেদনশীলতা: লাইট লিকুইড প্যারাফিন, হোয়াইট সফট প্যারাফিন বা এই ক্রিমের অন্য কোনো উপাদানের প্রতি যাদের পূর্ব থেকেই অতিসংবেদনশীলতা বা অ্যালার্জি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা যাবে না।
খোলা ক্ষত বা ইনফেকশন: ত্বকের কোনো স্থানে যদি কাঁচা কাটা-ছেঁড়া, গভীর খোলা ক্ষত বা পুঁজযুক্ত ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সরাসরি সেই স্থানে এই ক্রিমটি লাগানো উচিত নয়।
চোখে ব্যবহার নিষিদ্ধ: এটি শুধুমাত্র বাহ্যিক ত্বকের জন্য তৈরি, তাই চোখ, নাকের ভেতর বা মুখের ভেতরের নরম ঝিল্লিতে যেন এটি প্রবেশ না করে সেদিকে খেয়াল রাখুন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে ওষুধ যে উদ্দেশ্যে বা যে রোগের জন্যই ব্যবহৃত হোক না কেন, তা শরীরের সুনির্দিষ্ট কিছু প্রবেশপথ বা মাধ্যমের সাহায্যে দেওয়া হয়ে থাকে। একেই ঔষধের রুট বা প্রয়োগ প্রক্রিয়া বলা হয়। মানুষের রোগ এবং ওষুধের উপাদানের ওপর ভিত্তি করে প্রধান রুটগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়:
দেহের অভ্যন্তরে বা সিস্টেমিক রুট (Internal Routes):
মুখে সেবন (Orally): ট্যাবলেট, ক্যাপসুল বা সিরাপ।
পায়ু ও যোনিপথে (Rectally & Vaginally): সাপোজিটরি বা লোকাল ক্রিম হিসেবে।
নিঃশ্বাসের মাধ্যমে (Inhalation): অ্যাজমার ইনহেলার বা নেবুলাইজার।
জিহ্বার নিচে (Sublingually): দ্রুত কাজ করার জন্য কিছু বিশেষ ট্যাবলেট।
অনান্ত্রিক বা ইনজেকশন পথ (Parenteral Routes): আন্তঃধমনী বোলাস (Intravenous Bolus), আন্তঃধমনী ইনফিউশন ወይም স্যালাইন (Intravenous Infusion), আন্তঃপেশী (Intramuscular Injenction) এবং সাবকিউটেনিয়াস বা ত্বকের নিচের স্তর (Subcutaneous)।
দেহের বাইরে বা লোকাল রুট (External Routes):
ত্বকের ওপর বা টপিক্যাল (Topically): ইমোলেন্ট ক্রিমটি মূলত এই টপিক্যাল (Topical) রুটের অন্তর্ভুক্ত। এটি সরাসরি দেহের বাইরের ত্বকের ওপর প্রয়োগ করা হয়, যা রক্তের মূল প্রবাহে না মিশে শুধুমাত্র স্থানীয় বা নির্দিষ্ট স্থানের চর্মরোগ নিরাময়ে সরাসরি কাজ করে।
ইমোলেন্ট ক্রিমের প্যারাফিন উপাদানগুলো মূলত ‘অক্লুসিভ ময়েশ্চারাইজার’ (Occlusive Moisturizer) হিসেবে কাজ করে। যখন এটি ত্বকে লাগানো হয়, তখন এটি ত্বকের সবচেয়ে বাইরের স্তর ‘স্ট্র্যাটাম কর্নিয়াম’ (Stratum Corneum)-এর কোষগুলোর মধ্যবর্তী ফাটল বা লিপিডের ঘাটতি পূরণ করে দেয়। এর ফলে ত্বক থেকে প্রাকৃতিকভাবে জলীয় বাষ্প হয়ে পানি উড়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া (Transepidermal Water Loss – TEWL) বন্ধ হয়ে যায়। ত্বক তার ভেতরের আর্দ্রতা ফিরে পাওয়ায় একজিমা বা সোরিয়াসিসের কারণে সৃষ্ট চামড়ার খসখসে ভাব, লালচে টানটান ভাব ও চুলকানি দ্রুত প্রশমিত হয়।
সরবরাহ ও প্যাক সাইজ: বাজারে Emolent ক্রিম সাধারণত ২৫ গ্রামের একটি ল্যামিনেটেড টিউব প্যাকেজে সরবরাহ করা হয়।
সংরক্ষণ নিয়ম: ক্রিমটি ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় (৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে) ঠান্ডা ও শুষ্ক স্থানে সংরক্ষণ করুন। সরাসরি অতিরিক্ত তাপ, আলো ও আর্দ্রতা থেকে দূরে রাখুন এবং ব্যবহারের পর টিউবের ক্যাপটি শক্ত করে আটকে রাখুন। অবশ্যই শিশুদের নাগালের সম্পূর্ণ বাইরে রাখুন।
ইমোলেন্ট ক্রিমের ক্ষেত্রে কেন সচেতনতা জরুরি? ইমোলেন্ট ক্রিমটি মূলত ত্বকের আর্দ্রতা রক্ষা এবং একজিমা-সোরিয়াসিসের ড্রাইনেস কমানোর জন্য একটি থেরাপিউটিক ক্রিম। এটি কোনো ত্বক ফর্সা করার কসমেটিক ক্রিম বা ফেসিয়াল ক্রিম নয়। অনেকেই না জেনে এটিকে সাধারণ বিউটি ক্রিম হিসেবে ব্যবহার করেন, যা অনুচিত। এ ছাড়া ত্বকে যদি ব্যাকটেরিয়ার কারণে কোনো পুঁজযুক্ত ইনফেকশন বা ফাঙ্গাল ইনফেকশন (যেমন—দাউদ বা চুলকানি) হয়ে থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শুধু এই ময়েশ্চারাইজিং ক্রিম দিলে ইনফেকশন আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে চর্মরোগের সঠিক কারণ জানা জরুরি।
বাস্তবমুখী লাইফস্টাইল টিপস: ত্বকের শুষ্কতা এবং একজিমার সমস্যা থেকে দীর্ঘমেয়াদী মুক্তি পেতে শুধুমাত্র ক্রিমের ওপর নির্ভর না করে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনা আবশ্যক। গোসলের সময় অতিরিক্ত গরম জল ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন, কারণ গরম জল ত্বকের প্রাকৃতিক তেল ধুয়ে ফেলে। গোসলে সবসময় মৃদু বা ক্ষারহীন সাবান (যেমন—বেবি সাবান বা ময়েশ্চারাইজিং বার) ব্যবহার করুন। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে (কমপক্ষে ৮-১০ গ্লাস) পানি পান করুন এবং খাদ্য তালিকায় তাজা শাকসবজি ও ফলমূল রাখুন। সুস্থ, সুন্দর ও দীপ্তিময় ত্বকের জন্য সচেতনতাই হোক আপনার প্রধান শক্তি।
উত্তর: হ্যাঁ, যদি আপনার মুখের ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক বা খসখসে হয়ে থাকে, তবে ইমোলেন্ট ক্রিম মুখে ব্যবহার করা যাবে। তবে আপনার ত্বক যদি তৈলাক্ত (Oily) বা একনে-প্রোন (Acne-prone) হয়, অর্থাৎ মুখে অতিরিক্ত ব্রণ হওয়ার প্রবণতা থাকে, তবে মুখে এই ক্রিমটি ব্যবহার না করাই ভালো, কারণ এর প্যারাফিন উপাদান লোমকূপ বন্ধ করে ব্রণের সমস্যা বাড়াতে পারে।
উত্তর: হ্যাঁ, ইমোলেন্ট ক্রিমের উপাদানগুলো (লিকুইড ও সফট প্যারাফিন) অত্যন্ত মৃদু এবং রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয় হওয়ায় এটি শিশুদের সংবেদনশীল ত্বকের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। শিশুদের শীতকালীন শুষ্কতা বা ডায়াপার র্যাশের কারণে সৃষ্ট শুষ্কতা দূর করতে চিকিৎসকের পরামর্শে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
উত্তর: এটি একটি ময়েশ্চারাইজিং বা স্কিন প্রোটেক্ট্যান্ট ক্রিম হওয়ায় ত্বকের শুষ্কতা থাকা পর্যন্ত এটি দীর্ঘ সময় ধরে নিরাপদেই ব্যবহার করা যায়। তবে একজিমা বা সোরিয়াসিসের তীব্র আক্রমণের সময় চিকিৎসকের নির্দেশিত মূল ওষুধের (যেমন—টপিক্যাল স্টেরয়েড বা ইমিউনোমডুলেটর) সাথে এটি কতদিন এবং কীভাবে মিলিয়ে লাগাবেন, তা আপনার চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে জেনে নেওয়া উত্তম।
এই লেখা শুধুমাত্র শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে। ওষুধ সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সুস্থ থাকার প্রধান চাবিকাঠি হলো একটি সচল পরিপাকতন্ত্র। আমরা প্রতিদিন যে শর্করা, আমিষ কিংবা চর্বিযুক্ত খাবার খাই, তা…
মার্চ 9, 2024
আধুনিক যুগের তীব্র প্রতিযোগিতা, মানসিক চাপ কিংবা পারিপার্শ্বিক নানা কারণে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়া অত্যন্ত সাধারণ…
মার্চ 9, 2024বাংলায় সহজ ভাষায় ওষুধ নির্দেশিকা, রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার এবং মেডিকেল পাঠ্যক্রম।
© মেডিকেল গুরুকুল। এই সাইটের তথ্য শুধুমাত্র শিক্ষামূলক; ওষুধ সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।