বাংলায় নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা ও ওষুধ তথ্য

মানবদেহে অন্ত্রের বিভিন্ন ধরণের কৃমি বা পরজীবী সংক্রমণের (Intestinal Parasitic Infections) চিকিৎসায় অত্যন্ত সুপরিচিত, নিরাপদ ও কার্যকর একটি ওষুধ হলো Almex (এ্যালমেক্স)। এটি একক বা মিশ্র কৃমি ধ্বংস করে দ্রুত নিরাময় প্রদান করে।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জিসকা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড (Ziska Pharmaceuticals Ltd.) কর্তৃক প্রস্তুতকৃত এই ওষুধের মূল কার্যকরী উপাদান হলো এ্যালবেনডাজল (Albendazole)। এটি মূলত একটি ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিহেলমিন্থিক (Broad-Spectrum Anthelmintic Agent) শ্রেণির ওষুধ। বাজারে এটি সাধারণত ৪০০ মি.গ্রা. সেব্য ট্যাবলেট এবং ২০০ মি.গ্রা./৫ মি.লি. সাসপেনশন (তরল) হিসেবে পাওয়া যায়। আজকের আলোচনায় আমরা এ্যালমেক্স ওষুধের উপাদান, চিকিৎসাগত নির্দেশনাবলী, সেবনবিধি, বায়ো-কেমিক্যাল কার্যপদ্ধতি, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ড্রাগ মিথস্ক্রিয়া এবং এর বিশেষ সতর্কতা নিয়ে বিস্তারিত জানব।
মেডিকেল সতর্কতা: এটি একটি সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিহেলমিন্থিক ওষুধ। গর্ভাবস্থায় এবং এক বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি সেবন করা অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে।
Table of Contents
ToggleAlmex হলো অন্ত্রের একক বা মিশ্র কৃমি প্রতিরোধ ও নির্মূলে ব্যবহৃত একটি ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিহেলমিন্থিক ওষুধ।
ওষুধের শ্রেণি: অ্যান্টিহেলমিন্থিক / কৃমিনাশক এজেন্ট (Anthelmintic Agent)।
প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান: জিসকা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড (Ziska Pharmaceuticals Ltd.)।
উপাদান ও বিভিন্ন ফর্মুলেশন:
এ্যালমেক্স ৪০০ ট্যাবলেট (Almex 400 Tablet): প্রতিটি চিউয়েবল ট্যাবলেটে রয়েছে এ্যালবেনডাজল ৪০০ মি.গ্রা.।
এ্যালমেক্স সাসপেনশন (Almex Suspension): প্রতি ৫ মি.লি. তৈরি করা তরলে রয়েছে এ্যালবেনডাজল ২০০ মি.গ্রা. (১০ মি.লি. বোতল)।
এ্যালমেক্স প্রধানত নিম্নে উল্লিখিত কৃমি ও পরজীবীজনিত সংক্রমণে নির্দেশিত:
এসকারিয়াসিস (Ascariasis): গোলকৃমি সংক্রমণ।
এন্টারোবিয়াসিস (Enterobiasis): সুতাকৃমি বা পিনওয়ার্ম সংক্রমণ।
বক্রকৃমি (Hookworm Infection): অ্যানক্লোস্টোমা ও নেকেটর প্রজাতিজনিত সংক্রমণ।
ট্রাইচুরিয়াসিস (Trichuriasis): হুইপওয়ার্ম সংক্রমণ।
স্ট্রংগাইলইডিয়াসিস (Strongyloidiasis): থ্রেডওয়ার্ম সংক্রমণ।
টিনিয়াসিস (Taeniasis): ফিতাকৃমি সংক্রমণ।
হাইডাটিড রোগ (Hydatid Disease): Echinococcus granulosus নামক পরজীবী দ্বারা সৃষ্ট লিভার বা ফুসফুসের সিস্টিক সংক্রমণ।
সংক্রমণের ধরণ ও রোগীর বয়সের ওপর ভিত্তি করে এ্যালমেক্স সেবনের মাত্রা নির্ধারিত হয়।
১ থেকে ২ বছর বয়সী শিশু: একক মাত্রা হিসেবে ১ চা-চামচ বা ৫ মি.লি. এ্যালমেক্স সাসপেনশন অথবা অর্ধেক এ্যালমেক্স ৪০০ মি.গ্রা. ট্যাবলেট (২০০ মি.গ্রা.) সেব্য।
প্রাপ্তবয়স্ক ও ২ বছরের বেশি বয়সী শিশু: একক মাত্রা হিসেবে ১টি এ্যালমেক্স ৪০০ মি.গ্রা. ট্যাবলেট অথবা ১০ মি.লি. এ্যালমেক্স সাসপেনশন সেব্য।
বিশেষ নোট (সুতাকৃমি/Pinworm): পুনঃসংক্রমণ (Re-infection) রোধ করতে ২ সপ্তাহ পর একই মাত্রার আরেকটি ডোজ সেবন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সকল সদস্যের একসাথে চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
স্ট্রংগাইলইডিয়াসিস ও ফিতাকৃমি (টিনিয়াসিস): প্রাপ্তবয়স্ক ও ২ বছরের ঊর্ধ্বের শিশুদের ক্ষেত্রে প্রতিদিন ১টি করে এ্যালমেক্স ৪০০ মি.গ্রা. ট্যাবলেট পরপর ৩ দিন সেব্য।
হাইডাটিড রোগ (Hydatid Disease): প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রতিদিন ৪০০ মি.গ্রা. করে দিনে ২ বার (সকাল ও রাত) মোট ২৮ দিন সেবন করতে হয়। অবস্থার ওপর ভিত্তি করে ১৪ দিনের বিরতি দিয়ে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে একাধিক কোর্স চালানো লাগতে পারে।
ট্যাবলেটটি চিবিয়ে, গিলে বা গুঁড়ো করে পানির সাথে খাওয়া যায়।
এটি সাধারণ খাবারের সাথে বা খালি পেটে খাওয়া যায়; তবে চর্বিযুক্ত বা তৈলাক্ত খাবারের সাথে খেলে রক্তে এ্যালবেনডাজলের শোষণ ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।
এ্যালবেনডাজল (Albendazole) কৃমির অভ্যন্তরীণ শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়:
গ্লুকোজ শোষণ রোধ: এটি কৃমির ‘টিউবুলিন’ প্রোটিনের সাথে যুক্ত হয়ে সেটির পলিমারাইজেশন বাধাগ্রস্ত করে। ফলে কৃমি তার বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় গ্লুকোজ শোষণ করতে পারে না।
শক্তি হ্রাস ও মৃত্যু: শক্তি সঞ্চয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃমি অবশ হয়ে মারা যায় এবং মলত্যাগের মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে শরীর থেকে বের হয়ে যায়।
একক মাত্রায় এ্যালমেক্স অত্যন্ত সুসহনীয়। তবে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসায় কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে:
সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: তলপেটে অস্বস্তি বা মৃদু ব্যথা, বমি বমি ভাব, বমি, ডায়রিয়া।
অন্যান্য প্রতিক্রিয়া: সাময়িক মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, ত্বকে চুলকানি বা চুল পড়ে যাওয়া (Alopecia – দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারে)।
দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের প্রতিক্রিয়া: লিভার এনজাইমের মাত্রা বৃদ্ধি (Hepatotoxicity) এবং শ্বেত রক্তকণিকা কমে যাওয়া (Leukopenia)। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার ক্ষেত্রে নিয়মিত রক্ত ও লিভার পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক।
প্রতিনির্দেশনা (যাদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ):
এ্যালবেনডাজল বা এর কোনো উপাদানের প্রতি অতি-সংবেদনশীলতা (Allergy) থাকলে।
গর্ভাবস্থায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
বিশেষ সতর্কতা:
১ বছরের কম বয়সী শিশু: ১ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এর নিরাপত্তা সুপ্রতিষ্ঠিত নয়, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দেওয়া অনুচিত।
লিভারের সমস্যা: তীব্র যকৃৎ বা লিভারের ব্যাধি থাকলে সতর্কতার সাথে ব্যবহার করতে হবে।
অন্য ওষুধের সাথে প্রতিক্রিয়া (Drug Interactions):
ডেক্সামিথাসোন, প্রাজিকোয়ারটেল ও সিমেটিডিন: এই ওষুধগুলো রক্তে এ্যালবেনডাজলের ঘনত্ব বাড়িয়ে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
গর্ভাবস্থায়: সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ (Strictly Contraindicated)। এটি ভ্রূণের মারাত্মক ক্ষতি বা জন্মগত ত্রুটি (Teratogenic Effect) ঘটাতে পারে। সন্তান ধারণে সক্ষম নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক ঋতুস্রাবের প্রথম ৭ দিনের মধ্যে নেগেটিভ প্রেগনেন্সি টেস্ট নিশ্চিত হয়েই এটি সেবন করা উচিত।
স্তন্যদানকালে: এটি মাতৃদুগ্ধে নিঃসৃত হয় কিনা তা নিশ্চিত নয়। সাবধানতা হিসেবে স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রে এটি সেবনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।
এ্যালমেক্স ৪০০ ট্যাবলেট: ২৫ x ২টির স্ট্রিপে (মোট ৫০টি ট্যাবলেট) সরবরাহ করা হয়।
এ্যালমেক্স সাসপেনশন: ১০ মি.লি. বোতলে সরবরাহ করা হয়।
সংরক্ষণ: ৩০° সে.-এর নিচে শুষ্ক ও আলো থেকে দূরে সংরক্ষণ করুন। শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন।
হ্যাঁ। বিশেষ করে সুতাকৃমি বা সাধারণ কৃমির সংক্রমণ পরিবারের অন্যদের মধ্যে দ্রুত ছড়ায়। তাই লক্ষণ না থাকলেও একই দিনে পরিবারের সবার কৃমির ওষুধ সেবন করা উচিত।
এ্যালমেক্স দিন বা রাতের যেকোনো সময় সেবন করা যায়। তবে রাতে ভারী বা চর্বিযুক্ত খাবারের পর খেলে এর কার্যকারিতা ভালো হয়।
সাধারণত প্রতি ৬ মাস পর পর প্রতিরোধমূলক হিসেবে কৃমির ওষুধ সেবন করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এই লেখা শুধুমাত্র শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে। ওষুধ সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সুস্থ থাকার প্রধান চাবিকাঠি হলো একটি সচল পরিপাকতন্ত্র। আমরা প্রতিদিন যে শর্করা, আমিষ কিংবা চর্বিযুক্ত খাবার খাই, তা…
মার্চ 9, 2024
আধুনিক যুগের তীব্র প্রতিযোগিতা, মানসিক চাপ কিংবা পারিপার্শ্বিক নানা কারণে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়া অত্যন্ত সাধারণ…
মার্চ 9, 2024বাংলায় সহজ ভাষায় ওষুধ নির্দেশিকা, রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার এবং মেডিকেল পাঠ্যক্রম।
© মেডিকেল গুরুকুল। এই সাইটের তথ্য শুধুমাত্র শিক্ষামূলক; ওষুধ সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।