বাংলায় নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা ও ওষুধ তথ্য

বাংলাদেশে থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতিজনিত সমস্যায় বহুল ব্যবহৃত একটি ওষুধ হলো থাইরিন (Thyrin)। এর সক্রিয় উপাদান হলো লিভোথাইরক্সিন সোডিয়াম (Levothyroxine Sodium), যা শরীরের প্রাকৃতিক থাইরয়েড হরমোনের (T4) একটি সিন্থেটিক বা কৃত্রিম রূপ। যখন থাইরয়েড গ্রন্থি পর্যাপ্ত পরিমাণে হরমোন তৈরি করতে পারে না, তখন এই ওষুধটি শরীরের হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক করতে ব্যবহৃত হয়।
আজকের আর্টিকেলে আমরা থাইরিন ট্যাবলেটের উপাদান, নির্দেশনা, সেবন মাত্রা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং সতর্কতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
Table of Contents
Toggleথাইরয়েড হরমোন, যার মধ্যে থাইরিন (লিভোথাইরক্সিন) অন্তর্ভুক্ত, তা স্থূলতা বা ওজন কমানোর চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়। যাদের থাইরয়েড হরমোন স্বাভাবিক আছে, তাদের ক্ষেত্রে এই ওষুধ ওজন কমাতে কাজ করে না এবং অধিক মাত্রায় গ্রহণে এটি গুরুতর বা এমনকি জীবনঘাতী বিষক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
থাইরিন ট্যাবলেট দুটি ভিন্ন শক্তিতে (Strength) বাজারে পাওয়া যায়:
থাইরিন (Thyrin) ৫০ ট্যাবলেট: প্রতিটি ট্যাবলেটে আছে লিভোথাইরক্সিন সোডিয়াম বিপি ৫০ মাইক্রোগ্রাম।
সরবরাহ: প্রতিটি বাক্সে থাকে ৯০টি ট্যাবলেট।
থাইরিন (Thyrin) ২৫ ট্যাবলেট: প্রতিটি ট্যাবলেটে আছে লিভোথাইরক্সিন সোডিয়াম বিপি ২৫ মাইক্রোগ্রাম।
সরবরাহ: প্রতিটি বাক্সে থাকে ৬০টি ট্যাবলেট।
থাইরিন মূলত নিম্নলিখিত চিকিৎসাগত অবস্থায় নির্দেশিত:
শরীরে থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি পূরণে (রিপ্লেসমেন্ট বা সাপ্লিমেন্ট থেরাপী হিসেবে) এটি ব্যবহৃত হয়। নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্র হলো:
প্রাইমারী হাইপোথাইরয়েডিজম: থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যার কারণে।
সেকেন্ডারী হাইপোথাইরয়েডিজম: পিটুইটারী গ্রন্থির সমস্যার কারণে।
টারসিয়ারী হাইপোথাইরয়েডিজম: হাইপোথ্যালামিক সমস্যার কারণে।
কনজেনিটাল (জন্মগত) বা এ্যাকোয়ার্ড (পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট) হাইপোথাইরয়েডিজম।
সাবক্লিনিক্যাল হাইপোথাইরয়েডিজম।
নোট: সাবএ্যাকিউট থাইরয়েডাইটিসে সৃষ্ট অস্থায়ী হাইপোথাইরয়েডিজমে এটি ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।
পিটুইটারী গ্রন্থি থেকে TSH হরমোন নিঃসরণ কমানোর জন্য:
বিভিন্ন ধরণের ইউথাইরয়েড গলগন্ডের (Euthyroid goiter) চিকিৎসা ও প্রতিরোধে।
সাবএ্যাকিউট বা ক্রণিক লিম্ফোসাইটিক থাইরয়েডাইটিস (হাসিমোটোস থাইরয়েডাইটিস)।
মাল্টিনোডিউলার গলগন্ড।
থাইরয়েড ক্যান্সারে: সার্জারী ও রেডিও আয়োডিন থেরাপির সাথে সহায়ক চিকিৎসা হিসেবে।
থাইরিন ট্যাবলেট প্রতিদিন একই সময়ে খালি পেটে খাওয়া শ্রেয় (সাধারণত সকালে নাস্তার ৩০-৬০ মিনিট আগে)। খাবারের পর পরই খেলে এর শোষণ কমে যেতে পারে।
ওষুধের মাত্রা রোগীর অবস্থা, বয়স, ওজন এবং নিয়মিত ল্যাবরেটরী পরীক্ষার (যেমন- TSH, Free T4) ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।
প্রারম্ভিক মাত্রা: সাধারণত দৈনিক ২৫-৫০ মাইক্রোগ্রাম।
মাত্রা সমন্বয়: রোগীর শারীরিক অবস্থা ও ল্যাবরেটরী পরীক্ষার পরিমাপ অনুযায়ী টিএসএইচ (TSH) স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রতি ৬-৮ সপ্তাহের ব্যবধানে ধীরে ধীরে মাত্রা ১২.৫-২৫ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে।
মারাত্মক হাইপোথাইরয়েডিজম: প্রারম্ভিক মাত্রা দৈনিক ১২.৫-২৫ মাইক্রোগ্রাম। রক্তে TSH এর পরিমাণ স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত প্রতি ২-৪ সপ্তাহ পর পর দৈনিক ২৫ মাইক্রোগ্রাম হারে মাত্রা বাড়ানো যেতে পারে।
সেকেন্ডারী বা টারসিয়ারী হাইপোথাইরয়েডিজম: রক্তে ফ্রি T4 (Free T4) এর পরিমাণ স্বাভাবিক সীমায় না আসা পর্যন্ত মাত্রা সমন্বয় করতে হবে।
৫০ বছরের অধিক বয়স্ক বা হৃদরোগী: প্রারম্ভিক মাত্রা দৈনিক ২৫ থেকে ৫০ মাইক্রোগ্রাম, যা ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ পর পর প্রয়োজন অনুসারে বাড়ানো হয়।
শিশুদের ক্ষেত্রে ওষুধের মাত্রা তাদের বয়স এবং শরীরের ওজনের ওপর নির্ভর করে।
প্রতি কেজি দৈহিক ওজন হিসেবে অনুমোদিত দৈনিক মাত্রা:
০-৩ মাস: দৈনিক ১০-১৫ মাইক্রোগ্রাম/কেজি।
৩-৬ মাস: দৈনিক ৮-১০ মাইক্রোগ্রাম/কেজি।
৬-১২ মাস: দৈনিক ৬-৮ মাইক্রোগ্রাম/কেজি।
১-৫ বছর: দৈনিক ৫-৬ মাইক্রোগ্রাম/কেজি।
৬-১২ বছর: দৈনিক ৪-৫ মাইক্রোগ্রাম/কেজি।
>১২ বছর (অসম্পূর্ণ বৃদ্ধি): দৈনিক ২-৩ মাইক্রোগ্রাম/কেজি।
পরিপূর্ণ বৃদ্ধি ও বয়ঃসন্ধি: দৈনিক ১.৭ মাইক্রোগ্রাম/কেজি।
শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষ নোট:
নবজাতক: অনুমোদিত প্রারম্ভিক মাত্রা দৈনিক ১০-১৫ মাইক্রোগ্রাম/কেজি। কার্ডিয়াক ফেইলরের ঝুঁকি থাকলে কম মাত্রায় শুরু করতে হবে। ল্যাবরেটরী পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী ৪-৬ সপ্তাহের মধ্যে মাত্রা বাড়ানো হবে।
যদি রক্তে T4 এর ঘনত্ব খুব কম (<৫ মাইক্রোগ্রাম/ডেসিলিটার) বা নিরূপণের অযোগ্য হয়, তবে প্রারম্ভিক মাত্রা হবে দৈনিক ৫০ মাইক্রোগ্রাম।
দীর্ঘস্থায়ী বা মারাত্মক হাইপোথাইরয়েডিজমে: প্রারম্ভিক মাত্রা দৈনিক ২৫ মাইক্রোগ্রাম। প্রত্যাশিত ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত প্রতি ২-৪ সপ্তাহ পরপর ২৫ মাইক্রোগ্রাম হারে বাড়াতে হবে।
বড় শিশুদের হাইপারএ্যাকটিভিটি: উপসর্গ কমানোর জন্য স্বাভাবিক পূর্ণ মাত্রার এক-চতুর্থাংশ (১/৪) দিয়ে শুরু করতে হবে এবং প্রতি সপ্তাহে ধীরে ধীরে মাত্রা বাড়িয়ে পূর্ণ মাত্রায় আসতে হবে।
নিম্নলিখিত অবস্থায় থাইরিন ব্যবহার করা যাবে না:
সাবক্লিনিক্যাল বা ওভার্ট থাইরোটক্সিকোসিস (অতিরিক্ত থাইরয়েড হরমোন), যদি তার চিকিৎসা করা না হয়ে থাকে।
এ্যাকিউট মাইওকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (হার্ট অ্যাটাক)।
ওষুধের যেকোনো উপাদানের প্রতি অতিসংবেদনশীলতা।
লিভোথাইরক্সিনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলো মূলত অতিরিক্ত মাত্রা ব্যবহারের কারণে হয়ে থাকে (হাইপারথাইরয়েডিজমের লক্ষণসমূহ)। উপসগগুলো হলো:
সাধারণ: ক্লান্তি, ক্ষুধা বৃদ্ধি, ওজন হ্রাস, তাপ অসহনীয়তা, জ্বর, অতিরিক্ত ঘাম।
স্নায়ু সম্বন্ধীয়: মাথা ব্যথা, হাইপারএ্যাকটিভিটি (অতিরিক্ত সক্রিয়তা), স্নায়ু দৌর্বল্য, দুশ্চিন্তা, অসহনশীলতা, অতিরিক্ত আবেগ, নিদ্রাহীনতা।
পেশী ও কঙ্কালতন্ত্র: কাঁপুনী, পেশীর দুর্বলতা।
রক্ত সংবহনতন্ত্র: বুক ধরফর করা, ট্যাকিকার্ডিয়া (দ্রুত হৃদস্পন্দন), এ্যারিদমিয়া (অনিয়মিত হৃদস্পন্দন), নাড়ির স্পন্দন এবং রক্তচাপ বৃদ্ধি।
শ্বসনতন্ত্র: শ্বাসকষ্ট।
পরিপাকতন্ত্র: পাতলা পায়খানা, বমি, পেটব্যথা।
ত্বক: চুল পড়া, ত্বক লালচে হওয়া।
গর্ভাবস্থায় ব্যবহার: ক্যাটাগরি এ (Category A)। গর্ভাবস্থায় লিভোথাইরক্সিন ব্যবহার নিরাপদ এবং অত্যাবশ্যক। গর্ভাবস্থায় শরীরে লিভোথাইরক্সিনের চাহিদা বৃদ্ধি পায়, তাই চিকিৎসকের পরামর্শে মাত্রা সমন্বয় করা প্রয়োজন।
স্তন্যদানকালীন ব্যবহার: মাতৃদুগ্ধে খুব সামান্য পরিমাণ থাইরয়েড হরমোন নিঃসৃত হয়, যা শিশুর ওপর তেমন কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না। তবুও স্তন্যদানকারী মায়ের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
থাইরিন অন্যান্য কিছু ওষুধের কার্যকারিতা পরিবর্তন করতে পারে বা অন্য ওষুধ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে।
এ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট: ট্রাই/টেট্রাসাইক্লিক এ্যান্টিডিপ্রেসেন্টের সাথে ব্যবহারে উভয় ওষুধের কার্যকারিতা এবং বিষক্রিয়া বাড়তে পারে, যা কার্ডিয়াক এ্যারিদমিয়া এবং সিএনএস স্টিমুলেশনের ঝুঁকি বাড়ায়।
অ্যান্টিডায়াবেটিক বা ইনসুলিন: লিভোথাইরক্সিন সেবনকারী ডায়াবেটিস রোগীদের ইনসুলিন বা অ্যান্টিডায়াবেটিক ওষুধের চাহিদা বেড়ে যেতে পারে।
ডিজিটালিস: হাইপোথাইরয়েড রোগী স্বাভাবিক অবস্থায় আসার ফলে রক্তে ডিজিটালিস গ্লাইকোসাইডের প্রভাব কমতে পারে।
দ্রষ্টব্য: আয়রন সাপ্লিমেন্ট, ক্যালসিয়াম কার্বোনেট এবং কিছু এন্টাসিড লিভোথাইরক্সিনের শোষণে বাধা দিতে পারে। তাই এই ওষুধগুলোর মধ্যে অন্তত ৪ ঘণ্টার ব্যবধান থাকা উচিত।
মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে তীব্র হাইপারথাইরয়েডিজমের লক্ষণসমূহ দেখা দেয়।
লক্ষণ: দ্বিধাগ্রস্ততা, ডিসওরিয়েন্টেশন, সেরেব্রাল এমবোলিজম, শক, কোমা, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে (দীর্ঘমেয়াদী মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি)।
চিকিৎসা: মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের লক্ষণসমূহ দূর না হওয়া পর্যন্ত তাৎক্ষণিকভাবে লিভোথাইরক্সিনের ব্যবহার বন্ধ রাখতে হবে অথবা মাত্রা কমিয়ে ব্যবহার করতে হবে। গুরুতর ক্ষেত্রে হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
আলো ও আর্দ্রতা থেকে দূরে, ৩০° সে. তাপমাত্রার নিচে ঠান্ডা ও শুষ্ক স্থানে সংরক্ষণ করুন। শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন।
সতর্কীকরণ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। এটি কোনো পেশাদার চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। থাইরিন বা যেকোনো প্রেসক্রিপশন ওষুধ সেবনের আগে অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং প্রেসক্রিপশনে বর্ণিত মাত্রা ও নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলুন।
এই লেখা শুধুমাত্র শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে। ওষুধ সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সুস্থ থাকার প্রধান চাবিকাঠি হলো একটি সচল পরিপাকতন্ত্র। আমরা প্রতিদিন যে শর্করা, আমিষ কিংবা চর্বিযুক্ত খাবার খাই, তা…
মার্চ 9, 2024
আধুনিক যুগের তীব্র প্রতিযোগিতা, মানসিক চাপ কিংবা পারিপার্শ্বিক নানা কারণে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়া অত্যন্ত সাধারণ…
মার্চ 9, 2024বাংলায় সহজ ভাষায় ওষুধ নির্দেশিকা, রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার এবং মেডিকেল পাঠ্যক্রম।
© মেডিকেল গুরুকুল। এই সাইটের তথ্য শুধুমাত্র শিক্ষামূলক; ওষুধ সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।