বাংলায় নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা ও ওষুধ তথ্য

পাকস্থলীর অতিরিক্ত এসিড নিরাময়, বুক জ্বালা, পেপটিক আলসার ও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার সমাধানে ব্যবহৃত অত্যন্ত কার্যকর ও পরিচিত একটি ওষুধ হলো Lanso (ল্যানসো)। এটি পাকস্থলীতে এসিড নিঃসরণ কমিয়ে আলসার দ্রুত শুকাতে এবং খাদ্যনালীর প্রদাহ দূর করতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড (Incepta Pharmaceuticals Ltd.) কর্তৃক প্রস্তুতকৃত এই ওষুধের মূল কার্যকরী উপাদান হলো ল্যানসোপ্রাজোল (Lansoprazole)। এটি মূলত প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর (Proton Pump Inhibitor – PPI) শ্রেণির একটি ওষুধ। বাজারে এটি সাধারণত ১৫ মি.গ্রা. এবং ৩০ মি.গ্রা. ক্যাপসুল ফর্মে পাওয়া যায়। আজকের আলোচনায় আমরা ল্যানসো ওষুধের উপাদান, চিকিৎসাগত নির্দেশনাবলী, সেবনবিধি, বায়ো-কেমিক্যাল কার্যপদ্ধতি, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ড্রাগ মিথস্ক্রিয়া এবং এর বিশেষ সতর্কতা নিয়ে বিস্তারিত জানব।
মেডিকেল সতর্কতা: ল্যানসো গ্যাস্ট্রিক ও আলসারজনিত অস্বস্তি কমাতে অত্যন্ত কার্যকর হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর সেবন করা উচিত নয়। এতে শরীরে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও ভিটামিন বি১২ শোষণে বিঘ্ন ঘটতে পারে।
Table of Contents
ToggleLanso হলো পাকস্থলীর প্যারাইটাল কোষ থেকে ক্ষতিকারক অতিরিক্ত এসিড নিঃসরণ বন্ধ করতে সক্ষম একটি ওষুধ।
ওষুধের শ্রেণি: প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর (Proton Pump Inhibitor / Anti-ulcerant)।
প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান: ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড (Incepta Pharmaceuticals Ltd.)।
উপাদান ও ফর্মুলেশন:
ল্যানসো ১৫ ক্যাপসুল (Lanso 15 Capsule): প্রতিটি ক্যাপসুলে রয়েছে ল্যানসোপ্রাজোল ১৫ মি.গ্রা.।
ল্যানসো ৩০ ক্যাপসুল (Lanso 30 Capsule): প্রতিটি ক্যাপসুলে রয়েছে ল্যানসোপ্রাজোল ৩০ মি.গ্রা.।
ল্যানসো ক্যাপসুল প্রধানত পেপটিক আলসার এবং অতিরিক্ত এসিড সম্পর্কিত নিম্নে উল্লিখিত রোগসমূহের চিকিৎসায় নির্দেশিত:
গ্যাস্ট্রিক ও ডিওডেনাল আলসার (Gastric & Duodenal Ulcer): পাকস্থলী বা ডিওডেনামের ঘা বা আলসার নিরাময় ও প্রতিরোধে।
ইসোফ্যাগাইটিস ও জিইআরডি (Gastroesophageal Reflux Disease – GERD): অতিরিক্ত এসিডের কারণে খাদ্যনালীতে প্রদাহ, ক্ষত বা মারাত্মক বুক জ্বালা উপশমে।
এইচ. পাইলোরি জীবাণু নির্মূল (H. pylori Eradication): পাকস্থলীর আলসার সৃষ্টিকারী Helicobacter pylori ব্যাকটেরিয়া দূরীকরণে থ্রি-পল থেরাপির (Triple Therapy) অংশ হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিকের সাথে।
জলিঞ্জার-এলিসন সিন্ড্রোম (Zollinger-Ellison Syndrome): যেসব ক্ষেত্রে পাকস্থলীতে অস্বাভাবিক ও বিপুল পরিমাণে এসিড নিঃসৃত হয়।
ব্যথানাশক ওষুধজনিত আলসার প্রতিরোধ (NSAID-induced Ulcer): দীর্ঘমেয়াদে ব্যথানাশক সেবনের ফলে সৃষ্ট আলসার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায়।
ল্যানসো সাধারণত খালি পেটে, সকালের খাবারের অন্তত ৩০ মিনিট আগে সেবন করা উত্তম। ক্যাপসুলটি চিবিয়ে না খেয়ে পুরো গিলে সেবন করতে হয়।
ডিওডেনাল আলসার: ৩০ মি.গ্রা. দিনে ১ বার (টানা ২ থেকে ৪ সপ্তাহ)।
গ্যাস্ট্রিক আলসার ও ইরোসিভ ইসোফ্যাগাইটিস: ৩০ মি.গ্রা. দিনে ১ বার (টানা ৪ থেকে ৮ সপ্তাহ)।
গ্যাস্ট্রিকের সাধারণ সমস্যা ও রক্ষণমাত্রা (Maintenance Therapy): ১৫ মি.গ্রা. দিনে ১ বার।
এইচ. পাইলোরি নির্মূলে: ৩০ মি.গ্রা. দিনে ২ বার (নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক থেরাপির সাথে ৭ থেকে ১৪ দিন)।
জলিঞ্জার-এলিসন সিন্ড্রোম: প্রারম্ভিক মাত্রা সাধারণত ৬০ মি.গ্রা. দিনে ১ বার (পরবর্তীতে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী মাত্রা বাড়ানো বা কমানো হতে পারে)।
ল্যানসোপ্রাজোল এসিড উৎপাদনের মূল উৎসকে নিষ্ক্রিয় করে কাজ করে:
প্যারাইটাল কোষে এনজাইম ব্লক: এটি পাকস্থলীর প্যারাইটাল কোষের ক্ষরিত এসিডের শেষ ধাপে $H^+/K^+$ ATPase എൻজাইম (প্রোটন পাম্প)-কে সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিরোধ করে।
এসিড নিঃসরণ দমন: এর ফলে খাদ্যগ্রহণ বা অন্যান্য উদ্দীপনার কারণে সৃষ্ট সব ধরণের এসিড নিঃসরণ বন্ধ হয়ে যায়।
আলসার নিরাময়: পাকস্থলীতে এসিডের অম্লতা হ্রাস পাওয়ায় ক্ষত বা আলসার দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে।
ল্যানসো সাধারণত অত্যন্ত নিরাপদ ও সুসহনীয়। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে মৃদু ও ক্ষণস্থায়ী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে:
সাধারণ প্রতিক্রিয়া: মাথাব্যথা, মাথা ঝিমঝিম করা, বমি বমি ভাব, পাতলা পায়খানা, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটে বাতাস জমা বা পেট ব্যথা।
অন্যান্য: মুখ বা গলার শুষ্কতা, অম্ল স্বাদযুক্ত বা তেতো অনুভূতি, ত্বকে চুলকানি বা হালকা র্যাশ।
দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারে সতর্কতা: ১ বছরের বেশি সময় ধরে পিপিআই সেবন করলে হাড় দুর্বল হওয়া (অস্টিওপোরোটিক ফ্র্যাকচার), রক্তে ম্যাগনেসিয়াম কমে যাওয়া (Hypomagnesemia) এবং ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
প্রতিনির্দেশনা (যাদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ):
ল্যানসোপ্রাজোল বা অন্যান্য প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর (যেমন: ওমিপ্রাজোল, এসমোপ্রাজোল)-এর প্রতি অতি-সংবেদনশীলতা থাকলে।
বিশেষ সতর্কতা:
ক্যানসার পরীক্ষা: ল্যানসোপ্রাজোল সেবনের আগে পাকস্থলীর মারাত্মক রোগ বা ম্যালিগন্যান্সি (Malignancy) আছে কিনা তা যাচাই করে নেওয়া ভালো, কারণ এটি ক্যানসারের লক্ষণগুলো সাময়িকভাবে কমিয়ে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব ঘটাতে পারে।
লিভারের সমস্যা: তীব্র যকৃতের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কম মাত্রায় (যেমন: ১৫ মি.গ্রা.) সেবন করা উচিত।
অন্য ওষুধের সাথে প্রতিক্রিয়া (Drug Interactions):
কেটোকোনাজোল/ইট্রাকোনাজোল: এসিড কমে যাওয়ায় এসব অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের শোষণ কমে যেতে পারে।
ডিগক্সিন, ওয়ারফারিন ও থিওফাইলিন: এসব ওষুধের সাথে সেবনে চিকিৎসকের তদারকি প্রয়োজন।
গর্ভাবস্থায়: এটি প্রেগনেন্সি ক্যাটাগরি B এর অন্তর্ভুক্ত। তবে নিরাপত্তার খাতিরে খুব বেশি প্রয়োজন না হলে গর্ভাবস্থায় এটি পরিহার করা ভালো। কেবল চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট পরামর্শে এটি সেবন করা যাবে।
স্তন্যদানকালে: ল্যানসোপ্রাজোল মাতৃদুগ্ধে নি নিঃসৃত হয় কিনা তা নিশ্চিত নয়। তাই স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রে এটি সেবনে সতর্কতা অবলম্বন করা অথবা ওষুধ সেবনকালে স্তন্যদান বন্ধ রাখা উচিত।
ল্যানসো ১৫ ক্যাপসুল: প্রতি বাক্সে ৫ x ১০ টি (৫০টি) ক্যাপসুল স্ট্রিপ প্যাকেটে পাওয়া যায়।
ল্যানসো ৩০ ক্যাপসুল: প্রতি বাক্সে ৫ x ৬ টি (৩০টি) ক্যাপসুল অ্যালু-অ্যালু প্যাকেটে পাওয়া যায়।
সংরক্ষণ: ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে, আলো ও আর্দ্রতা থেকে দূরে ঠান্ডা ও শুষ্ক স্থানে রাখুন। শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন।
ল্যানসো সবচেয়ে ভালো কাজ করে খালি পেটে, সকালের খাবারের অন্তত ৩০ মিনিট পূর্বে সেবন করলে। তবে ভুলবশত খালি পেটে না খেলে খাবারের পরেও সেবন করা যায়, তবে কার্যকারিতা কিছুটা কম হতে পারে।
যারা পুরো ক্যাপসুল গিলতে পারেন না, তারা ক্যাপসুলটি খুলে ভেতরের পেলেটগুলো (Pellets) না চিবিয়ে সামান্য জুস বা আপেলের সসের সাথে মিশিয়ে সাথে সাথে গিলে খেতে পারেন।
সাধারণ এসিডিটি বা পেপটিক আলসারের জন্য চিকিৎসকরা সাধারণত ২ থেকে ৮ সপ্তাহ সেবনের পরামর্শ দেন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া একটানা দীর্ঘদিন এটি সেবন করা অনুচিত।
এই লেখা শুধুমাত্র শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে। ওষুধ সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সুস্থ থাকার প্রধান চাবিকাঠি হলো একটি সচল পরিপাকতন্ত্র। আমরা প্রতিদিন যে শর্করা, আমিষ কিংবা চর্বিযুক্ত খাবার খাই, তা…
মার্চ 9, 2024
আধুনিক যুগের তীব্র প্রতিযোগিতা, মানসিক চাপ কিংবা পারিপার্শ্বিক নানা কারণে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়া অত্যন্ত সাধারণ…
মার্চ 9, 2024বাংলায় সহজ ভাষায় ওষুধ নির্দেশিকা, রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার এবং মেডিকেল পাঠ্যক্রম।
© মেডিকেল গুরুকুল। এই সাইটের তথ্য শুধুমাত্র শিক্ষামূলক; ওষুধ সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।