বাংলায় নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা ও ওষুধ তথ্য

শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity) বৃদ্ধি, কোষের সঠিক গঠন এবং ক্ষতের দ্রুত আরোগ্যের জন্য অন্যতম প্রয়োজনীয় মৌলিক অণুপষ্টি বা ট্রেস এলিমেন্ট (Trace Element) হলো জিংক (Zinc)। বিশেষ করে শিশু বয়সে তীব্র ডায়রিয়ার কারণে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে জিংক ও প্রয়োজনীয় তরল বেরিয়ে যায়। ডায়রিয়া পরবর্তী সময়ে শিশুর অন্ত্রের প্রদাহ দূর করতে, দ্রুত আরোগ্য লাভ করতে এবং পরবর্তী কয়েক মাস ঘনঘন ডায়রিয়া প্রতিরোধে জিংক সাপ্লিমেন্টেশন বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত কার্যকরী হিসেবে স্বীকৃত।
বাংলাদেশের বাজারে শিশুদের জিংকের ঘাটতি পূরণ এবং ডায়রিয়ার চিকিৎসায় চিকিৎসকদের বহুল ব্যবহৃত ও নির্ভরযোগ্য একটি ডিসপারসিবল (পানিতে দ্রুত দ্রবণীয়) ট্যাবলেট হলো Square Zinc (স্কয়ার জিংক)। আজকের নিবন্ধে আমরা এই জরুরি ওষুধের উপাদান, সঠিক সেবনবিধি, ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং যৌক্তিক ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
জরুরি মেডিকেল ডিসক্লেমার (Medical Disclaimer): স্কয়ার জিংক মূলত একটি প্রয়োজনীয় নিউট্রিশনাল সাপ্লিমেন্ট হলেও, শিশুর সুনির্দিষ্ট রোগ বা সমস্যার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের নির্দেশমতো সঠিক মাত্রা ও মেয়াদ মেনে সেবন করানো উচিত। বিশেষ করে ডায়রিয়ার সময় জিংকের সাথে ওরাল রিহাইড্রেশন সল্টস (ORS) বা খাবার স্যালাইন প্রয়োগ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
Table of Contents
Toggleজেনেরিক উপাদান: জিংক সালফেট মনোহাইড্রেট ইউএসপি (Zinc Sulfate Monohydrate USP)।
মাত্রাগত ঘনত্ব: প্রতিটি ডিসপারসিবল ট্যাবলেটে জিংক সালফেট মনোহাইড্রেট রয়েছে, যা ২০ মি.গ্রা. মৌলিক জিংক (Elemental Zinc)-এর সমতুল্য।
ওষুধের শ্রেণি: নিউট্রিশনাল সাপ্লিমেন্ট / মিনারেল (Nutritional Supplement)।
কাজের ধরন: এটি শরীরের প্রয়োজনীয় জিংকের অভাব পূরণ করে, এনজাইমের সঠিক কার্যকারিতা বজায় রাখে, অন্ত্রের এপিথেলিয়াল কোষ পুনর্গঠন করে এবং শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে।
স্কয়ার জিংক ট্যাবলেট: প্রতিটি বাক্সে ৩ x ১০ (মোট ৩০টি) ডিসপারসিবল ট্যাবলেট স্ট্রিপ প্যাকে সরবরাহ করা হয়।
২ মাস থেকে ৫ বছরের শিশুদের ডায়রিয়ার চিকিৎসায় এবং অন্ত্রের দ্রুত নিরাময়ে ওআরএস (ORS) বা খাবার স্যালাইনের পাশাপাশি স্কয়ার জিংক ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি।
শারীরিক ও হাড়ের সমস্যা: অরুচি বা ক্ষুধামন্দা, স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া (Stunted growth) এবং বিকৃত হাড় তৈরি।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার দুর্বলতা: দুর্বল ইমিউন সিস্টেম এবং পুনঃসংঘটনশীল বা ঘনঘন শ্বাসনালীর সংক্রমণ (Recurrent respiratory infections)।
ত্বক ও ক্ষতের সমস্যা: অ্যাকরোডার্মাটাইটিস এন্টারোপ্যাথিকা (Acrodermatitis enteropathica), প্যারাকেরাটেটিক ত্বকের ক্ষত এবং অপূর্ণ বা বিলম্বিত ক্ষতের আরোগ্য (Delayed wound healing)।
অন্যান্য সমস্যা: রক্তস্বল্পতা (Anemia), রাতকানা রোগ (Night blindness) এবং মানসিক অশান্তি বা মেজাজ খিটখিটে হওয়া।
┌──────────────────────────────────────────────┐
│ স্কয়ার জিংক সেবন মাত্রার সারসংক্ষেপ │
└──────────────────────┬───────────────────────┘
│
┌───────────────────────┴───────────────────────┐
▼ ▼
┌──────────────────────────┐ ┌──────────────────────────┐
│ ডায়রিয়ার চিকিৎসায় │ │ অন্যান্য ঘাটতিপূরণে │
└─────────────┬────────────┘ └─────────────┬────────────┘
│ │
• ২ – ৬ মাস: ১০ মি.গ্রা./দিন (১০–১৪ দিন) • < ১০ কেজি: ১০ মি.গ্রা. (দিনে ২ বার)
• ৬ মাস – ৫ বছর: ২০ মি.গ্রা./দিন (১০–১৪ দিন) • ১০ – ৩০ কেজি: ২০ মি.গ্রা. (দিনে ১–৩ বার)
• > ৩০ কেজি/প্রাপ্তবয়স্ক: ৪০ মি.গ্রা. (দিনে ১–৩ বার)
ডায়রিয়া শুরু হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব জিংক সেবন শুরু করা উচিত এবং ডায়রিয়া ভালো হয়ে গেলেও পুরো ১০ থেকে ১৪ দিন নিয়মিত চালিয়েই যেতে হবে:
২ মাস থেকে ৬ মাস বয়সী শিশু: দৈনিক ১০ মি.গ্রা. (আধা ট্যাবলেট) করে ১০-১৪ দিন।
৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশু: দৈনিক ২০ মি.গ্রা. (১টি পুরো ট্যাবলেট) করে ১০-১৪ দিন।
শিশুদের ক্ষেত্রে দৈহিক ওজন হিসেবে অনুমোদিত মাত্রা হলো দৈনিক ২ থেকে ২.৫ মি.গ্রা./কেজি।
১০ কেজির নিচে শিশুদের ক্ষেত্রে: ১০ মি.গ্রা. জিংক (আধা ট্যাবলেট) দৈনিক ২ বার।
১০ কেজি থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত শিশুদের ক্ষেত্রে: ২০ মি.গ্রা. জিংক (১টি ট্যাবলেট) দৈনিক ১ থেকে ৩ বার।
৩০ কেজির ঊর্ধ্বে শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে: ৪০ মি.গ্রা. জিংক (২টি ট্যাবলেট) দৈনিক ১ থেকে ৩ বার।
জিংক সালফেট বা এর কোনো উপাদানের প্রতি তীব্র অতিসংবেদনশীলতা (Allergy) থাকলে ব্যবহার করা যাবে না।
ডায়রিয়ার সময় জিংক দেওয়ার সাথে সাথে পর্যাপ্ত রিহাইড্রেশন অর্থাৎ ওআরএস (ORS), ডাবের পানি বা স্যালাইন নিশ্চিত করতে হবে। জিংক কখনোই খাবার স্যালাইনের বিকল্প নয়, বরং এটি স্যালাইনের সহযোগী হিসেবে কাজ করে।
টেট্রাসাইক্লিন ও কুইনোলোন অ্যান্টিবায়োটিক: অ্যান্টিবায়োটিকের (যেমন: Tetracycline, Ciprofloxacin) সাথে একত্রে জিংক সেবন করলে জিংক ও অ্যান্টিবায়োটিক উভয়েরই বিশোষণ বা শোষণ বাধাগ্রস্ত হয়। তাই জিংক এবং অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের মধ্যে নূন্যতম ৩ ঘণ্টার বিরতি রাখতে হবে।
পেনিসিলামিন (Penicillamine): পেনিসিলামিন লবণের সাথে একত্রে জিংক ব্যবহার করলে পেনিসিলামিনের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে।
হালকা বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।
পেটে সামান্য অস্বস্তি বা বদহজম।
ধাতব স্বাদ (Metallic taste) অনুভব করা।
অনেক অভিভাবক ডায়রিয়া ২ বা ৩ দিনে বন্ধ হয়ে গেলে জিংক খাওয়ানো বন্ধ করে দেন। এটি একটি ভুল ধারণা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউনিসেফ (UNICEF)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী ডায়রিয়া বন্ধ হলেও জিংকের ১০-১৪ দিনের পূর্ণ কোর্স সম্পন্ন করতে হয়। কারণ এই পূর্ণ মেয়াদের কোর্সটি শিশুর ক্ষতিগ্রস্ত অন্ত্রকে ভেতর থেকে পুরোপুরি নিরাময় করে এবং পরবর্তী ২ থেকে ৩ মাস পর্যন্ত শিশুকে নতুন করে ডায়রিয়া বা শ্বাসনালীর সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়া থেকে সুরক্ষা দেয়।
পুষ্টিকর খাবার: প্রাকৃতিক উপায়ে জিংকের ঘাটতি মেটাতে রোগীকে ডিমের কুসুম, লাল মাংস, মুরগির মাংস, শিমের বিচি, বাদাম, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার এবং ডাল খেতে দিন।
পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা: শিশুদের ডায়রিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণ থেকে মুক্ত রাখতে খাবার প্রস্তুত ও গ্রহণের আগে ভালোভাবে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
বুকের দুধ: ৬ মাসের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়ার সময়ও নিয়মিত মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যেতে হবে।
ওষুধের সংজ্ঞা: ওষুধ বা ভেষজ হলো এমন রাসায়নিক উপাদান যা প্রয়োগে প্রাণীদেহের স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া প্রভাবিত হয় এবং যা রোগের নিরাময়, উপশম বা প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়। ওষুধ মূলত দুই প্রকার: থেরাপিউটিক (রোগনিরাময়কারী) এবং প্রোফাইলেকটিক (রোগ প্রতিরোধকারী)।
FDA-এর সংজ্ঞার্থ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (FDA) সংজ্ঞার্থ অনুসারে: “যেসব দ্রব্য রোগ নির্ণয়, আরোগ্য (Cure), উপশম (Mitigation), প্রতিকার (Treatment) বা প্রতিরোধে (Prevention) ব্যবহৃত হয় এবং যা মানুষ বা অন্য প্রাণীর শারীরিক গঠন বা কার্যকলাপে প্রভাব ফেলে, সেগুলোকে ওষুধ বলে।”
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর দৃষ্টিভঙ্গি: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে ওষুধ এমন রাসায়নিক উপাদান যার আরোগ্য ও প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে অথবা যা শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে ফার্মাকোলজিতে ওষুধ বলতে জীবের বায়োকেমিক্যাল ও ফিজিওলজিক্যাল প্রক্রিয়াকে পরিবর্তনকারী রাসায়নিক উপাদানকে বোঝায়।
উত্তর: একটি পরিষ্কার চা-চামচে সামান্য পরিমাণ ফুটানো ঠান্ডা পানি, খাবার স্যালাইনের পানি অথবা মায়ের বুকের দুধ নিন। এবার তাতে ১টি স্কয়ার জিংক ট্যাবলেট দিন। এটি মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভেঙে পুরোপুরি গলে যাবে। এবার চামচটি শিশুর মুখে দিয়ে সহজেই খাইয়ে দিন।
উত্তর: যদি জিংক ট্যাবলেট খাওয়ানোর ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে শিশু বমি করে ফেলে, তবে তাকে কিছুটা সময় দিন। শিশুর পেট শান্ত হলে আবার একই মাত্রায় জিংক খাইয়ে দিন। ডায়রিয়ার সময় খালি পেটে না খাইয়ে সামান্য কিছু খাওয়ানোর পর জিংক দিলে বমির প্রবণতা কমে যায়।
উত্তর: খাবার স্যালাইন এবং জিংক দুটোই ডায়রিয়ার সময় একসাথে চালোনো যায়। খাবার স্যালাইন শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া পানি ও ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতি পূরণ করে, আর জিংক অন্ত্রের ভেতরের ক্ষত দ্রুত সারায় ও মল শক্ত করতে সাহায্য করে। দুটি ওষুধই চিকিৎসকের নিয়ম মেনে পাশাপাশি চালানো নিরাপদ।
এই লেখা শুধুমাত্র শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে। ওষুধ সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সুস্থ থাকার প্রধান চাবিকাঠি হলো একটি সচল পরিপাকতন্ত্র। আমরা প্রতিদিন যে শর্করা, আমিষ কিংবা চর্বিযুক্ত খাবার খাই, তা…
মার্চ 9, 2024
আধুনিক যুগের তীব্র প্রতিযোগিতা, মানসিক চাপ কিংবা পারিপার্শ্বিক নানা কারণে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়া অত্যন্ত সাধারণ…
মার্চ 9, 2024বাংলায় সহজ ভাষায় ওষুধ নির্দেশিকা, রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার এবং মেডিকেল পাঠ্যক্রম।
© মেডিকেল গুরুকুল। এই সাইটের তথ্য শুধুমাত্র শিক্ষামূলক; ওষুধ সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।